এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি দেশটির প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে একটি সুদৃঢ় এবং অনতিক্রম্য ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বিদায় মুহূর্তটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে খামেনির এই আকস্মিক ও সহিংস হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং এটি সরাসরি ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ‘হৃৎপিণ্ডে আঘাত’ হানার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।
অন্যদিকে, তার অগণিত অনুসারী ও সমর্থকদের মধ্যে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা তার অবর্তমানে মারাত্মকভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে।
ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষত যখন সদ্য শুকাতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সংকটময় ও রাজনৈতিক রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে তার কার্যালয়টিকে গোটা দেশের ক্ষমতার অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও মূল কেন্দ্রে পরিণত করেন। রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তিনি নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন।
সশস্ত্র বাহিনীর কৌশলগত পরিচালনা, বিচার বিভাগের নীতি নির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বা গণমাধ্যমের প্রচারণার অভিমুখ এবং অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদস্থ নিয়োগের চাবিকাঠি ছিল তার একক সিদ্ধান্তে।
এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে তার নিরঙ্কুশ ও প্রশ্নাতীত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইরানের শাসনব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী এককেন্দ্রিক রূপ দান করে। খামেনির দীর্ঘ শাসনকালের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ও চালিকাশক্তি ছিল ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ বা আইআরজিসি।
মূলত তার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও দিকনির্দেশনার অধীনেই আইআরজিসি সাধারণ একটি সামরিক বাহিনীর খোলস পাল্টে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়।
রাষ্ট্রের প্রতিটি লাভজনক ও কৌশলগত খাতে এই বাহিনীর আধিপত্য ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যকে সম্পূর্ণভাবে খামেনির অনুকূলে নিয়ে আসে এবং দেশের ভেতরে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকরভাবে রুখে দিতে এবং সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পেছনে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ও মেধা বিনিয়োগ করে।
খামেনির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দেয়। তবে ইরানের সমরাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যতটা না বিতর্ক হয়েছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি আন্তর্জাতিক শোরগোল ও তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে দেশটির পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সব সময় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, ইরান কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসাত্মক পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
তার স্পষ্ট ভাষ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বিশ্বের যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতো ইরানেরও একটি বৈধ এবং আইনগত অধিকার। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো, তার এই আশ্বাসে কখনোই আস্থা রাখতে পারেনি।
ফলস্বরূপ, পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের নির্দেশে তারা ধারাবাহিকভাবে ইরানের ওপর একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে। এই অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে খামেনির মূল ও সবচেয়ে সফল কৌশল ছিল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বন্ধুভাবাপন্ন সরকার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীর সঙ্গে একটি সুদৃঢ় কৌশলগত জোট বা প্রতিরোধ বলয় গঠন করা। তার এই সুদূরপ্রসারী নীতির ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও সামরিক বলয় অভাবনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু একই সঙ্গে এই নীতির কারণে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের কূটনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক বৈরিতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করে।
দীর্ঘ চার দশকের এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অবসানের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঠিক প্রথম দিনেই এক ভয়াবহ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।
তার এই মৃত্যু কেবল একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত নয়, বরং এটি ইরানের রাষ্ট্রীয় মতাদর্শ ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক প্রচণ্ড আঘাত। যে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তিনি যুগের পর যুগ ধরে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন, তার এই আকস্মিক প্রস্থানে সেই ব্যবস্থার স্থায়িত্ব, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক মহলে এবং খোদ ইরানের ভেতরেই এক বিশাল শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।