শনিবার মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএনের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। এই প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ঘোষণার পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হলো।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় নিজেদের সামরিক বাহিনী পাঠাতে পুরোপুরি প্রস্তুত বলে এর আগে ঘোষণা দিয়েছিল ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য।
পশ্চিমা এই দুই পরাশক্তির এমন বার্তার পরই শনিবার ইরান পাল্টা বিবৃতি দিয়ে যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি এই বিষয়ে তেহরানের অনড় অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, ওই অঞ্চলের একটি দায়িত্বশীল শক্তি এবং প্রণালির সার্বিক নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তাকারী হিসেবে ইরান এই নৌপথে বাইরের যেকোনো দেশের সামরিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সতর্ক করছে।
তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব কেবল এর তীরবর্তী ও উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপরই নির্ভর করে, বহিরাগত কোনো শক্তির ওপর নয়। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে কাজেম গরিবাবাদি ওই পোস্টে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যৌথ সামরিক তৎপরতা বিষয়ক একটি ঘোষণার চিত্রও যুক্ত করেন।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উভয় দেশই এই প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন সমুন্নত রাখতে নিজেদের নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এই বৈশ্বিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত এপ্রিলে বায়ান্নটি দেশের অংশগ্রহণে একটি বড়মাপের আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়েছিল।
এর পাশাপাশি, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দেওয়া একটি বিবৃতিরও তীব্র বিরোধিতা করেছে তেহরান। ওই বিবৃতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন যে, ফ্রান্স, ওমান এবং মিত্র দেশগুলো যৌথভাবে হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের কাজে সহযোগিতা করবে।
ম্যাক্রোঁর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, ওই নৌপথ থেকে মাইন অপসারণের কোনো প্রয়োজন হলে সেই কাজ একমাত্র ইরানই নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করবে।
আন্তর্জাতিক নৌপথে এমন উত্তেজনার পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে ইরান। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন প্রক্রিয়াকে ঘিরে দেশটিতে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
এই স্পর্শকাতর দাফন প্রক্রিয়া শুরুর ঠিক আগে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক শাখা ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর দেশটিকে লক্ষ্য করে যেকোনো সম্ভাব্য হামলার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে শত্রুদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সামরিক বাহিনীটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, এই শোকের আবহে শত্রুরা যদি বিন্দুমাত্র কোনো ভুল করে, তবে তার জবাব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ কঠোরভাবে দেওয়া হবে। তাদের সেই জবাব শত্রুদের লজ্জাজনক ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে বলে দাবি করেছে বাহিনীটি।
সামরিক বাহিনীর এমন আগ্রাসী বার্তার পেছনে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিকে তাদের পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন।
এই উসকানিমূলক মন্তব্যের পরই মূলত সামরিক বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান আরও কঠোর করেছে। খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যেকোনো নাশকতামূলক হামলার বিষয়ে ইরান বর্তমানে সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক রয়েছে।
তেহরানে আয়োজিত এই ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠানে লাখ লাখ সাধারণ ইরানি নাগরিকের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অসংখ্য গণ্যমান্য অতিথির অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। বিপুল এই জনসমাগমের কারণে অনুষ্ঠানস্থলগুলো নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বিশাল শোক মিছিলে কোনো ধরনের হামলা হলে তা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এছাড়া, এই অনুষ্ঠানে জনসমক্ষে আসা ইরানের ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারাও গুপ্তহত্যার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ইরান সরকার নজিরবিহীন নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দাফন প্রক্রিয়া শুরুর আগে থেকেই তেহরানের প্রতিটি রাস্তায় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত নিরাপত্তাকর্মীরা নিবিড়ভাবে টহল দিচ্ছেন।
শুধু স্থলভাগেই নয়, আকাশপথের সুরক্ষায়ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেহরান। নিরাপত্তার স্বার্থে আগামী সোমবার তেহরানের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার এক নজিরবিহীন ঘোষণাও দিয়েছে ইরান সরকার।