মাত্র একদিন আগে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির ‘অভিভাবক’ হিসেবে নিজেকে দাবি করে ট্রাম্প এক ঘোষণায় জানিয়েছিলেন যে, এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বেসামরিক কার্গো বা পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর দেওয়া নিশ্ছিদ্র সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিপুল ব্যয়ভার মেটাতে নির্দিষ্ট হারে এই শুল্ক প্রদান করতে হবে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেওয়া এই ঘোষণার মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি তাঁর পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে আসার কথা নিশ্চিত করেছেন। গতকাল নিজের মালিকানাধীন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত একটি বিশেষ ও বিস্তারিত বার্তার মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে এই নতুন সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় দেশগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ, গঠনমূলক ও ইতিবাচক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
এই রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে তাঁকে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে এই বাড়তি টোল বা শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা চিরতরে বাতিল করে, তবে নিকট ভবিষ্যতে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবে।
একই সাথে দুই অঞ্চলের মধ্যে অভূতপূর্ব বাণিজ্য সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে এই ধরনের বিশাল অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরপরই মূলত তিনি আন্তর্জাতিক জলপথে টোল আদায়ের পূর্ববর্তী পরিকল্পনা থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
এই প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক কত হবে বা যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক কোন কোন অর্থনৈতিক খাতে এই অর্থ প্রাথমিকভাবে ব্যয় করা হবে, সে সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বার্তায় সুস্পষ্ট কোনো পরিসংখ্যান বা বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেননি।
তবে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসতে যাওয়া এই সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ হবে আক্ষরিক অর্থেই বিপুল এবং মার্কিন অর্থনীতির জন্য অভাবনীয়।
এর ফলে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পণ্য প্রস্তুতকরণ খাত, ভারী শিল্পোৎপাদন এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি ‘ঐতিহাসিক উল্লম্ফন’ বা যুগান্তকারী ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হবে। মঙ্গলবারের ওই পোস্টে তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, এই বিশাল অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ মার্কিন ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় কারখানাগুলোর উৎপাদনশীলতা এমন অভাবনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।
এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফলাফল হিসেবে দেশজুড়ে লাখ লাখ নতুন ও উচ্চ-বেতনের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হবে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে এবং বেকারত্ব দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখবে।
টোল আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ করে চিরবৈরী ইরান ইস্যুতে কোনো ধরনের ছাড় দিতে একেবারেই নারাজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের সমগ্র আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়মিত টহল, কড়া নজরদারি এবং সামরিক উপস্থিতি আগের মতোই সম্পূর্ণভাবে অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বের অন্যান্য যেকোনো স্বাধীন দেশের বাণিজ্যিক ও বেসামরিক জাহাজ অবাধে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদে এই পথ ব্যবহার করে তাদের পণ্য পরিবহন করতে পারলেও, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কোনোভাবেই প্রযোজ্য হবে না।
তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের কোনো ধরনের জাহাজ এই আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহার করার সামান্যতম সুযোগও পাবে না। এমনকি ইরানের কোনো নৌযান তাদের নিজস্ব বন্দর ছেড়ে বাইরের জলসীমায় বের হতে পারবে না এবং বর্তমানে যেসব ইরানি জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছে, সেগুলোকেও পুনরায় তাদের নিজ দেশের বন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
কার্যত ইরানের সমস্ত নৌবন্দরের ওপর সম্পূর্ণ ও নিশ্ছিদ্র সামরিক অবরোধ পুনর্বহাল করার কঠোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সবশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বার্তায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে বর্তমানে চলমান বিশ্ববাণিজ্যের গতিশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বর্তমানে যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হচ্ছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের রেকর্ডকে বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে। এই নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ তেল সরবরাহের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব মার্কিন সামরিক বাহিনী ও নৌবাহিনীর অকুতোভয় সদস্যদের প্রাপ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং তাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
ভবিষ্যতেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল অব্যাহত থাকবে বলে তিনি বৈশ্বিক ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছেন, তবে শর্ত একটাই-এই প্রক্রিয়ায় ইরানের কোনো ধরনের অংশগ্রহণ বা উপস্থিতি থাকবে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং ফার্স্টপোস্টের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটপরিবর্তনের খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করেছে।