সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া বিভিন্ন উসকানিমূলক ও আগ্রাসী বক্তব্যের সরাসরি কড়া সমালোচনা করে তিনি এই জোরালো বার্তা প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তার এই সময়োচিত বক্তব্য প্রচার করেছে, যা মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধকে নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরে জানা যায়, রাজধানী তেহরানের ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক মুসাল্লা প্রাঙ্গণে ইসলামী বিপ্লবের এক প্রখ্যাত শহীদ নেতার স্মরণসভায় উপস্থিত হয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাংবাদিকদের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেন।
সেখানেই তিনি সমসাময়িক বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আসা নানাবিধ হুমকির বিষয়ে নিজ দেশের শক্ত ও অপরিবর্তনীয় অবস্থানের কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক কিছু উসকানিমূলক মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ইরানের সরকারপ্রধান তার নিজস্ব কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার এবং পরিমিতিবোধের বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সামনে নিয়ে আসেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক সেই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ‘অশোভন’ ও ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’ বলে সরাসরি আখ্যায়িত করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনেতার মুখ থেকে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন শব্দচয়ন কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং তা খোদ ওই বক্তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা ও মননশীলতারই একটি নগ্ন প্রতিফলন ঘটায়।
অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন যে, এ ধরনের অশালীন ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের বিপরীতে ঠিক একই ভাষায় বা একই কায়দায় জবাব দেওয়া ইরানের মহান হাজার বছরের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাই তেহরান এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি সংযত, যৌক্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখাটাই আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপূরক বলে মনে করে। অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও জাতীয় সংহতির বিষয়েও দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে জোরালো বার্তা দিয়েছেন ইরানের এই শীর্ষ নেতা।
দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনের যেসব অপশক্তি ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বিনষ্ট করে দেশটিকে বিভক্ত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, তাদের সেই দিবাস্বপ্ন ও হীন উদ্দেশ্য যে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে-সে কথাও তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার নিজস্ব মতাদর্শ, গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতির ওপর ভিত্তি করে নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বদা বদ্ধপরিকর। যেকোনো মূল্যে দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখতে ইরানের আপামর জনসাধারণ এবং সামরিক বাহিনী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলে তিনি জোরালো মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই সময়োচিত বক্তব্য এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা আধিপত্য ও ইরানের নিজস্ব প্রতিরোধমূলক সামরিক কৌশলের মধ্যে এক প্রকাশ্য ও নীরব দ্বন্দ্ব একেবারে চরমে পৌঁছেছে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই প্রকাশ্য ও নির্ভীক ঘোষণা মূলত ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের একটি প্রচ্ছন্ন অথচ অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা। এর মাধ্যমে ইরান সমগ্র বিশ্ব সম্প্রদায়কে মূলত এই বার্তাই অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে দিতে চাইছে যে, তারা কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ বা সামরিক হুমকির কাছে মাথানত করবে না এবং নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ডের সুরক্ষায় যেকোনো চূড়ান্ত বা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে তারা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগে ইরান যে সর্বদা প্রস্তুত, সেটিও এই দৃঢ় বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক এই পাল্টাপাল্টি বাক্যবাণ এবং রাজনৈতিক উত্তাপ আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার এমনিতেই নাজুক সম্পর্ককে আরও কতটা জটিল করে তোলে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।