মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ইরানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেশটির এই অনড়, আপসহীন ও কঠোর অবস্থানের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি নিয়ে ইরানের এমন কড়া হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে।
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ও শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া দেশের প্রতিরক্ষানীতি ও সামরিক অবস্থান সম্পর্কে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বিবৃতি প্রদান করেছেন।
ওই বিবৃতিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতি চরম ক্ষোভ ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ভূ-কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রসীমার পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, সার্বভৌমত্ব এবং সুরক্ষার প্রশ্নে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী কোনো অবস্থাতেই একচুলও পিছপা হবে না।
পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের পথ পুনরায় বাধাহীন ও উন্মুক্ত করার বিষয়ে তেহরানের একটিমাত্র শর্ত রয়েছে। আর তা হলো, পশ্চিমাদের অবশ্যই স্বাধীন ও সার্বভৌম ইরানি জনগণের ন্যায্য অধিকার এবং মর্যাদার প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
অন্যথায় নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই জলপথের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ কোনোভাবেই প্রত্যাহার করা হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
নিজেদের সামরিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক অনড় অবস্থানের কথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করে জেনারেল আকরামিনিয়া তার বিবৃতিতে আরও একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আবেগঘন বিষয়ের অবতারণা করেন।
তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইরান তার জাতীয় বীর এবং শহীদদের মহান আত্মত্যাগের কথা কখনোই বিস্মৃত হয়নি এবং হবেও না। বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবের অবিসংবাদিত শহীদ নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত ও উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে গোটা ইরানি জাতি এবং সামরিক বাহিনী মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যেকোনো মূল্যে, তা যত কঠিনই হোক না কেন, এবং এর জন্য যে ত্যাগই স্বীকার করতে হোক না কেন, এই প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি তার জোরালো বক্তব্যে উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এই মন্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরিচালিত পূর্ববর্তী অন্যায্য সামরিক অভিযান এবং গুপ্তহত্যার দিকেই সরাসরি ইঙ্গিত করে, যা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতাকে আরও জটিল ও সংঘাতময় করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ঘোষণা বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত বহন করছে। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল ও অত্যাবশ্যকীয় অংশের প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই অত্যন্ত সরু ও কৌশলগত জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়ে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়, যা বৈশ্বিক শিল্পের চাকা সচল রাখে।
সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘমেয়াদে অবরুদ্ধ, অস্থিতিশীল বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে নজিরবিহীন ও ব্যাপক অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে।
এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা থেকে উত্তরণ মোটেও সহজ হবে না। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর নজিরবিহীন উপস্থিতি ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের পর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে ব্যাপক তিক্ততা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরান বরাবরই তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক জলসীমায় যেকোনো ধরনের অননুমোদিত বিদেশি সামরিক উপস্থিতি ও আধিপত্য বিস্তারের পদক্ষেপকে তাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডন-এর বরাত দিয়ে প্রাপ্ত সূত্রমতে, বর্তমান এই চরম সংকটময় ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরানের এই অনমনীয় ও কঠোর সিদ্ধান্ত এটাই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তারা যেকোনো সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন বা অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় নিজেদের সর্বোচ্চ সামরিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি গ্রহণ করে রেখেছে।
এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এই উত্তেজনার জল কতদূর গড়ায় এবং পরাশক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত কূটনীতির মাধ্যমে এই জটিল সংকটের কোনো শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সমাধান বের করতে সক্ষম হয় কি না, সেদিকে।