মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ৭৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ৭৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অদূর ভবিষ্যতে প্রশমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরা। সাম্প্রতিক একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনমত জরিপে উঠে এসেছে যে, দেশটির প্রতি পাঁচজন নাগরিকের মধ্যে অন্তত চারজনই মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সর্বশেষ এই জরিপের ফলাফল মার্কিন নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা বহন করছে।

 

গত রোববার শেষ হওয়া তিন দিনব্যাপী এই নিবিড় জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৯ শতাংশ উত্তরদাতাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক অভিযান একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পরিণত হবে।

 

চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি দিনে দিনে আরও তীব্রতর হচ্ছে এবং এর পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের ওপর নতুন করে কঠোর অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই মূলত এই জনমত জরিপটি পরিচালনা করা হয়।

 

জরিপের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মার্চের শেষ ভাগে পরিচালিত ঠিক একই ধরনের একটি জরিপে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ৬৫ শতাংশ মানুষ, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

বিপরীতে, বর্তমানে মাত্র ১৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ বা হামলার পক্ষে নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন মাত্র ৩৭ শতাংশ উত্তরদাতা।

 

উল্লেখ্য, গত ২৬ জুন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অতর্কিত হামলার গুরুতর অভিযোগ তুলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন প্রশাসন।

 

সমগ্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে মোট এক হাজার উনিশ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এই গুরুত্বপূর্ণ জরিপে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে এই জরিপের সম্ভাব্য ত্রুটির মাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় চার শতাংশ।

 

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগের নীতিতেও অনড় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানিয়েছেন যে, পারস্য উপসাগরে ইরানের সকল প্রকার বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন প্রশাসন পুনরায় কঠোর অবরোধ কার্যকর করতে যাচ্ছে।

 

শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সকল পণ্যবাহী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ২০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত অর্থ বা শুল্ক আদায় করবে বলেও তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

এর আগে ইরান তাদের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার জবাবে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পাল্টা হুমকি প্রদান করেছিল। এই পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং অবরোধের ঘোষণার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক ড্রোন হামলার মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী অন্তত ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন যে, এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আগামী এক বছরের মধ্যে বিশ্ববাজারের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে।

 

তাছাড়া, অর্ধেক উত্তরদাতা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পেছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে যে চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক বা সার্থক নয়।

 

এই অন্তহীন সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেতে শুরু করেছে এবং বর্তমানে তা তার সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

 

মার্কিন রাজনীতি ও অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধজনিত এই সংকট ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত। রিপাবলিকান দলের নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশলবিদরাই স্বীকার করছেন যে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ববর্তী কর-ছাড় নীতির কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক সুফলগুলো ইতিমধ্যেই অনেকটাই ম্লান ও অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান এই যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

 

এই বিরূপ পরিস্থিতির কারণে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান দলের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ বা সিনেটেও দলটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

- এনডিটিভি