এই বিশাল জনসমুদ্রের মাধ্যমে তেহরান মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, শক্তি, অটুট সামর্থ্য এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ স্পৃহার বার্তা অত্যন্ত জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে চাইছে।
কিন্তু এই সুবিশাল, আবেগময় ও আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক গভীর শঙ্কা ও কাঠামোগত উদ্বেগ। ইরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তারা এই সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানে অতিরিক্ত ভিড়, পদদলিত হওয়ার শঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে প্রায় তিন হাজার মানুষের সম্ভাব্য মর্মান্তিক মৃত্যু বা হতাহতের আশঙ্কা করে অত্যন্ত গোপনে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
জার্মানভিত্তিক খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম ‘ওয়েল্ট’ শনিবার (৪ জুলাই) তাদের এক বিশেষ ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী তেহরানে অবস্থানরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাহসী সাংবাদিক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় চিঠির অনুলিপি তাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই সতর্কতামূলক ও অতি গোপনীয় চিঠিটি ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তরফ থেকে যৌথভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দেশটির প্রথম ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফের দপ্তরে সরাসরি পাঠানো হয়।
অত্যন্ত গোপন এই নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সপ্তাহব্যাপী চলমান এই সুবিশাল রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অত্যধিক ভিড় এবং জুলাই মাসের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের কারণে আনুমানিক দেড় হাজার থেকে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
শোকাহত জনতার বাঁধভাঙা আবেগ এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ হওয়ারও জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে ওই নথিতে। সম্ভাব্য এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি অত্যন্ত সুচারুরূপে সামাল দেওয়ার জন্য ইরানি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি বিশেষ জরুরি ইউনিট গঠন করা হয়েছে বলে ওই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
এই আগাম সতর্কতার সবচেয়ে দৃশ্যমান, মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো প্রমাণ মিলেছে রাজধানী তেহরানের বিখ্যাত ও সুবিশাল বেহেস্ত-ই জাহরা কবরস্থানে। সেখানে উদ্ভূত যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইতোমধ্যে নতুন করে কয়েক হাজার শূন্য কবর খনন করে রাখা হয়েছে।
তেহরান পৌরসভার এক মাঠপর্যায়ের কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে এই অভাবনীয় প্রস্তুতির খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, সম্ভাব্য মৃত্যুর বিপুল সংখ্যার কথা মাথায় রেখে প্রস্তুত করা ওই হাজার হাজার কবর সত্যিই সেখানে খনন করা হয়েছে এবং সেগুলো যেকোনো মুহূর্তে ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সূত্রগুলো মনে করছে, এত বড় মাত্রার একটি আবেগময় ও স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় আয়োজনে, যেখানে সমগ্র দেশ থেকে লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ তীব্র গরমের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর জড়ো হবেন, সেখানে তিন হাজার বা তারও বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও সেটি বাস্তবতার নিরিখে খুব অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়।
এর আগেও ইরানে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বড় ধরনের শোক মিছিলে অতিরিক্ত মানুষের চাপে পদদলিত হয়ে বহু মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক নজির রয়েছে। তবে বর্তমান এই বিশাল জনস্রোত শেষ পর্যন্ত কতটা সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি কতটা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে স্বয়ং আয়োজক ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যেই গভীর অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে।
এদিকে, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিন নিয়ে শোক যাত্রার এক অত্যন্ত বিস্তৃত ও দীর্ঘ পথপরিক্রমার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় সূচি অনুযায়ী, খামেনির পবিত্র মরদেহ প্রথমে রাজধানী তেহরানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে।
এরপর সেখান থেকে কফিনটি নিয়ে যাওয়া হবে আরেক পবিত্র ও ঐতিহাসিক ধর্মীয় শহর কোমে। সেখানে ধর্মীয় নেতাদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দেশের সীমানা পেরিয়ে কফিনটি বিশেষ ব্যবস্থায় নেওয়া হবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও ঐতিহাসিক কারবালায়, যা শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত আবেগের ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি স্থান।
সেখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও ভিনদেশি লাখো অনুসারীর শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে মরদেহটি পুনরায় ইরানে সসম্মানে ফিরিয়ে আনা হবে। সবশেষে আগামী ৯ জুলাই খামেনির জন্মস্থান এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র শহর মাশহাদে এক রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।
এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথের প্রতিটি স্থানেই লাখো মানুষের বাঁধভাঙা ঢল নামার কথা রয়েছে, যা পুরো দাফন প্রক্রিয়াটিকে ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ব্যবস্থাপনাগত, কাঠামোগত এবং নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত করেছে।