তাঁর এই আকস্মিক ও সহিংস প্রয়াণ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ ও সুদীর্ঘ যুগের চূড়ান্ত অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী চরম সংকটময় ও পুনর্গঠনের জটিল সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন খামেনি।
দীর্ঘ প্রায় চার দশকের শাসনকালে তাঁর দূরদর্শী ও সুদৃঢ় নেতৃত্বে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়টি দেশের সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান সম্প্রচারমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নিয়োগের ওপর একচ্ছত্র ও ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, যা ইরানের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী এককেন্দ্রিক রূপ দান করেছিল।
খামেনির দীর্ঘ শাসনামলের অন্যতম প্রধান ও সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য ছিল দেশের অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসি-র নজিরবিহীন ক্ষমতায়ন।
তাঁর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আইআরজিসি কেবল একটি প্রথাগত সামরিক বাহিনী হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, মূলধারার রাজনীতি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভূরাজনৈতিক চাপ ও বৈরিতা রুখে দেওয়ার কৌশল হিসেবে তিনি সামরিক সক্ষমতা জোরদারের ওপর বিশেষ জোর দেন।
এই প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধির অনড় যুক্তিতে ইরান তাঁর অধীনেই নিজেদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরানের সামরিক শক্তি ও সামর্থ্যের এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র বিরোধও খামেনির শাসনামলের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক ইস্যু ছিল। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি বারবার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বৈশ্বিক মঞ্চে দাবি করেছেন যে, ইরান কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
তবে একই সঙ্গে তিনি এটিও স্পষ্টভাবে স্পষ্ট করেছেন যে, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও অসামরিক উদ্দেশ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রক্ষার বিষয়ে ইরান সামান্যতম আপস করবে না।
তাঁর এই অনড় ও আপসহীন অবস্থানের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের ওপর দফায় দফায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও কৌশলের অংশ হিসেবে খামেনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মিত্র সরকার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার এক অনন্য নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই সুদূরপ্রসারী নীতির ফলস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে ইরানের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়।
তবে তেহরানের এই আধিপত্য বিস্তারের নীতির কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলো, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক বৈরিতা ও সামরিক উত্তেজনা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খামেনির এই আকস্মিক প্রয়াণ ইরানের রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোকে দুর্বল বা ভঙ্গুর করার পরিবর্তে বর্তমানে দেশটির সাধারণ জনগণের একটি বিশাল অংশের জন্য জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও দেশপ্রেমের এক নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তাঁর এই ঐতিহাসিক শেষ বিদায়কে ঘিরে সমগ্র দেশজুড়ে যেমন গভীর শোকের আবহ বিরাজ করছে, ঠিক তেমনিভাবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ পথচলা এবং আগামী দিনগুলোতে ইরানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গতিপথ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়েও বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে গভীর আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।