সোমবার, জুলাই ৬, ২০২৬
২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে চান ইরানের মোজতবা খামেনি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম

বাবার শেষকৃত্যে অংশ নিতে চান ইরানের মোজতবা খামেনি
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও সপ্তাহব্যাপী শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান ঘিরে এখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।

 

এই ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর প্রয়াত পিতা ও পূর্বসূরির এই কয়েকদিনব্যাপী বিদায় অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে গভীর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

 

তবে ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আনুষ্ঠানিকতার ঠিক কোন পর্যায়ে বা কীভাবে তিনি উপস্থিত হবেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

 

ইরানের অভ্যন্তরীণ ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, মোজতবা খামেনি তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে বাবার শেষ বিদায়ের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

 

তবে তাঁর এই ব্যক্তিগত অনুরোধ এখন পর্যন্ত কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছে তেহরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মোজতবা খামেনি যদি এই মুহূর্তে জনসমক্ষে উপস্থিত হন, তবে চিরবৈরী রাষ্ট্র ইসরায়েল তাঁকে লক্ষ্য করে নতুন কোনো সুপরিকল্পিত বিমান বা ড্রোন হামলা চালাতে পারে।

 

এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তাঁর এই প্রকাশ্য উপস্থিতির মাধ্যমে শত্রুপক্ষ হয়তো তাঁর বর্তমান গোপন আস্তানা ও অতি সুরক্ষিত অবস্থানের নিখুঁত সন্ধান পেয়ে যেতে পারে। এই ধরনের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতেই মূলত তাঁর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা তাঁকে এই মুহূর্তে কোনো ধরনের জনসমক্ষে আসার অনুমতি দিচ্ছেন না।

 

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মোজতবা খামেনি আগামী ৯ জুলাই তাঁর বাবার চূড়ান্ত দাফনকার্যের সময় তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে উপস্থিত থাকতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। তবে বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই ধরনের একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কতটা যৌক্তিক হবে, তা নিয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এবং সরকারের শীর্ষ মহলের মধ্যে গভীর বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

 

কারণ, চলমান এই সংঘাতের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মোজতবা খামেনির পরিবারের ওপর এক বিশাল ট্র্যাজেডি নেমে আসে। ওই হামলায় তাঁর সহধর্মিণী, তাঁর কিশোর সন্তান এবং পরিবারের বেশ কয়েকজন নিকটাত্মীয় অত্যন্ত মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হন।

 

গত বুধবার নিহত সেই প্রিয়জনদের স্মরণে তেহরানে একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে, নিজের স্ত্রী ও সন্তানের সেই অতি সংবেদনশীল বিদায় পর্বেও মোজতবা খামেনি সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না।

 

জানা গেছে, প্রথম দিনের সেই ভয়াবহ হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও অত্যন্ত গুরুতরভাবে শারীরিক আঘাত ও জখমের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং প্রিয়জনদের জানাজায় অংশ না নেওয়ার বিষয়টি বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনীতির পর্যবেক্ষকদের মনে এক নতুন এবং গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মহলে এখন জোর আলোচনা চলছে যে, গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি কি আসলেই শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন, নাকি বর্তমানের এই চরম সংকটের মুহূর্তে পর্দার আড়াল থেকে তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছেন।

 

এই ধরনের বহুমুখী শঙ্কা ও রহস্যের মাঝেই খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে ঘিরে পুরো ইরানে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ ইরানি নাগরিক এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন আগামী ৯ জুলাইয়ের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

 

মোজতবা খামেনি শেষ পর্যন্ত সব ধরনের কঠোর নিরাপত্তা বিধি ও চিকিৎসকদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তাঁর পিতার শেষ শয্যায় উপস্থিত হতে পারবেন কি না, তা দেখার জন্য গভীর অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল।

 

তাঁর এই সম্ভাব্য উপস্থিতি বা ধারাবাহিক অনুপস্থিতি আগামী দিনে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

 

- নিউইয়র্ক টাইমস