প্রিয় নেতাকে চিরবিদায় জানাতে ইরান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের পাঁচটি ঐতিহাসিক শহরজুড়ে টানা ছয় দিনব্যাপী এক সুবিশাল জানাজা ও দাফন কর্মসূচির আয়োজন করেছে তেহরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ ও বিস্তৃত বিদায় মিছিলে এক থেকে দুই কোটি শোকার্ত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আশা করা হচ্ছে।
ঠিক এমন এক অভাবনীয় ও আবেগঘন মুহূর্তে, যখন লাখো জনতা তাদের নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, তখন নতুন করে তুমুল আলোচনায় উঠে এসেছে খামেনির ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর অনাড়ম্বর জীবনাচরণ এবং তাঁর স্ত্রীর অসামান্য সাহসিকতার নানা শিক্ষণীয় দিক।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে যেমন প্রবল প্রতাপশালী ছিলেন, ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন ঠিক ততটাই সাদাসিধে। নিজের জীবনের নানা অজানা অধ্যায়, গভীর রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাঁর নিজের রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘সেল নম্বর ১৪’-তে।
এই বহুল পঠিত বইটিতে তিনি তাঁর সহধর্মিণী মনসুরেহ খোজাস্তেহ বাগেরজাদেহর আত্মত্যাগ, মানসিক দৃঢ়তা এবং সংসার জীবনে তাঁর সক্রিয় ও অসামান্য ভূমিকার কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
খামেনির লেখনীতে তাঁর স্ত্রীর যে প্রতিকৃতি ফুটে উঠেছে, তা কেবল একজন সাধারণ গৃহিণীর নয়, বরং একজন আদর্শ, সাহসী ও মহীয়সী নারীর, যিনি চরম বিপদের মুখেও হিমালয়ের মতো অবিচল ছিলেন।
বইটিতে নিজের স্ত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে খামেনি লিখেছেন যে, তাঁর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক জীবনে স্ত্রীর নীরব অথচ অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গেলে তাঁর স্ত্রীর অনন্য ব্যক্তিত্ব এবং মহৎ গুণাবলির ওপর সংক্ষেপে হলেও আলোকপাত করা একান্ত প্রয়োজন।
তিনি তাঁর স্ত্রীকে অত্যন্ত দৃঢ়চেতা এবং প্রবল উচ্চ মনোবলের অধিকারী একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আগে তৎকালীন শাসক শাহের কুখ্যাত গোপন পুলিশ বাহিনী 'সাভাক'-এর সদস্যরা যখন রাতের অন্ধকারে বারবার তাঁদের বাড়িতে আকস্মিক ও সশস্ত্র হামলা চালাত, তখনো তাঁর স্ত্রী বিন্দুমাত্র বিচলিত হতেন না।
খামেনি গভীর আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেছেন যে, সাভাক এজেন্টদের হাতে তিনি যখন নিজ গৃহেই নির্মমভাবে প্রহৃত হতেন এবং স্ত্রীর চোখের সামনে দিয়েই তাঁকে বারবার অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হতো, তখনো সেই ভয়ংকর মুহূর্তে তাঁর স্ত্রী কখনো সামান্যতম ভয়, মানসিক দুর্বলতা বা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ প্রকাশ করেননি।
চরম বিপদের মুখে স্ত্রীর এই অবিচল মানসিকতা খামেনিকে সব সময় প্রবল অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কারাবাসের সেই অন্ধকার ও নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে স্ত্রীর অবিচল সমর্থন কীভাবে তাঁকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রেখেছিল, তারও এক বিশদ ও হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা উঠে এসেছে এই আত্মজীবনীতে।
খামেনি লিখেছেন, বন্দিজীবনে তাঁর স্ত্রী যখনই তাঁকে কারাগারে দেখতে আসতেন, প্রতিবারই তাঁর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত উচ্চ মনোবল ও দৃঢ় চরিত্রের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠত। জেলের চার দেয়ালের ভেতরে স্ত্রীর সেই সামান্য সময়ের সাক্ষাৎ খামেনির হৃদয়কে এক অভাবনীয় আত্মবিশ্বাস এবং গভীর প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর স্ত্রী চরম মানসিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে কখনোই কারাগারের ভেতরে কোনো দুঃসংবাদ নিয়ে আসতেন না। সন্তানদের হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের কোনো উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কথা তিনি সযত্নে এড়িয়ে যেতেন, যাতে কারাবন্দি স্বামীর মানসিক শান্তি কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।
বিপ্লবের আগে ও পরে খামেনির পারিবারিক জীবনযাত্রা কেমন ছিল, তারও এক স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় এই স্মৃতিচারণে। খামেনি উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল একজন নারী। বিপ্লবের আগে বছরের পর বছর ধরে চলা চরম অর্থনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার কঠিন জীবন তিনি হাসিমুখে সহ্য করেছেন।
আবার বিপ্লবের পর যখন খামেনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার শিখরে আসীন হন, তখনো তাঁর স্ত্রী আগের সেই অনাড়ম্বর ও সরল জীবনযাপনের দর্শনের ওপরই শক্তভাবে অটল থেকেছেন। খামেনি পরম করুণাময়ের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিখেছেন যে, তাঁদের বসতঘর সব সময় যেকোনো ধরনের বিলাসিতা এবং অপ্রয়োজনীয় জাগতিক জিনিসপত্র থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল।
এমনকি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে যেসব সাধারণ আসবাবপত্র বা শৌখিন জিনিস দেখা যায়, তাঁদের বাড়িতে সেসবেরও কোনো স্থান ছিল না। খামেনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, বৈবাহিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি নিজ উদ্যোগে এমন কঠোর সংযম আরোপ করেছিলেন এবং স্ত্রীকে সেই অনাড়ম্বর জীবনধারার দিকে পরিচালিত করেছিলেন।
তবে এই সাদাসিধে ও বাহুল্যবর্জিত জীবনধারা সারা জীবন ধরে অবিচলভাবে রক্ষায় তাঁর স্ত্রীর নিজস্ব অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আত্মস্বীকৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন যে, জাগতিক মোহ ত্যাগ করার এই কঠিন সাধনার ক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী তাঁকে অনেক দূর ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।
এই মহীয়সী নারীর সংযমী ও আত্মত্যাগী জীবনের বহু অম্লান স্মৃতি আজও খামেনির মনে গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয় বলে তিনি বইটিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, তাঁর স্ত্রী সংসার জীবনে কখনো নিজের জন্য নতুন কোনো পোশাক কিনে দেওয়ার দাবি বা আবদার করেননি।
তিনি কেবল সন্তানদের বেড়ে ওঠার প্রয়োজনে তাদের জন্য নিত্যনতুন পোশাকের কথা মনে করিয়ে দিতেন এবং অনেক সময় নিজেই তা সাধারণ বাজার থেকে কিনে আনতেন। নারীদের স্বভাবজাত গয়নার প্রতি যে আকর্ষণ থাকে, তা থেকেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত।
তিনি কখনো নিজের জন্য কোনো অলংকার কেনেননি। উল্টো তাঁর বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া সব মূল্যবান অলংকার তিনি স্বেচ্ছায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন এবং সেই প্রাপ্ত অর্থ সম্পূর্ণভাবে দরিদ্রদের মাঝে দান-খয়রাতে ব্যয় করেছিলেন।
খামেনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে তাঁর স্ত্রীর কাছে মহামূল্যবান কোনো অলংকার তো দূরের কথা, হাতে পরার মতো একটি সাধারণ আংটিও অবশিষ্ট নেই। এমন এক নিঃস্বার্থ ও অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী ছিলেন বলেই খামেনির মতো একজন বিশ্বনেতার জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পেরেছিলেন তাঁর স্ত্রী।