ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, অন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ক্ষুধার্ত বা অভাবগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজেদের দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্দশার দিকে নজর দেওয়া।
বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের যে চার কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে চরম খাদ্যসংকটে রয়েছেন এবং দৈনন্দিন জীবনে সরকারি সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, তাদের কথা আগে ভাবার জন্য তিনি মার্কিন প্রশাসনের প্রতি তীব্র আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার এই বাগযুদ্ধ বর্তমানে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং কূটনৈতিক মহলে নতুন করে মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে। জানা গেছে, সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণের জীবনযাত্রা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি নেতিবাচক মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে দেশটিকে ক্ষুধার্ত হিসেবে ইঙ্গিত করেছিলেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে ইরানের জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করেছে তেহরান। এরই সরাসরি ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গত শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও সুচিন্তিত পোস্ট করেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
নিজের ওই বার্তায় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক বৈষম্যের চরম বাস্তবতাকে অত্যন্ত সুকৌশলে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। গালিবাফ তার পোস্টে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে লেখেন, আপনাদের সবার আগে উচিত নিজেদের দেশের চার কোটিরও বেশি নাগরিকের তীব্র খাদ্য সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।
যে দেশের কোটি কোটি মানুষ সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি বা বিশেষ কুপন ছাড়া নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে পারেন না, সেই দেশের নেতার মুখে অন্য একটি রাষ্ট্রকে ক্ষুধার্ত বলে উপহাস করা একেবারেই বেমানান, ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর।
ইরানি পার্লামেন্টের এই প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় নেতা তার প্রতিক্রিয়ায় আরও উল্লেখ করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্য নিছক কোনো সাধারণ দাবি বা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এটি অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ও সমস্যাগুলোকে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার একটি অপচেষ্টা মাত্র।
তিনি মার্কিন নেতৃত্বকে সরাসরি অভিযুক্ত করে বলেন, আপনারা নিজেদের দেশের ভেতরে থাকা প্রকট অর্থনৈতিক বৈষম্য, সীমাহীন দারিদ্র্য এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার চরম ব্যর্থতাগুলোকে আড়াল করতে চাইছেন।
আর নিজেদের সেই ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে অন্য একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের এ ধরনের অহংকারী ও ভিত্তিহীন আচরণকে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বহীন ও শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে মনে করেন।
নিজেদের রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও অত্যন্ত দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। মার্কিন প্রশাসনের যেকোনো ধরনের উপদেশ বা অযাচিত হস্তক্ষেপ চরমভাবে প্রত্যাখ্যান করে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি সংক্রান্ত যাবতীয় উপদেশ ও পরামর্শ তাদের নিজেদের দেশের জন্যই বরাদ্দ রাখা উচিত।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নিজেরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে বাইরের কোনো পরাশক্তি বা ভিনদেশি রাষ্ট্রের অযাচিত পরামর্শ, খবরদারি বা আধিপত্য বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই।
বরং তিনি মার্কিন প্রশাসনকে পাল্টা উপদেশ দিয়ে বলেন, আপনারা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অযথা মাথা না ঘামিয়ে বরং নিজেদের দেশের ক্রমবর্ধমান অপুষ্টির হার, বেকারত্ব এবং সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা দূর করার কাজে মনোযোগ দিন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ ও কয়েক দশক ধরে চলা বৈরিতারই একটি নতুন ও প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ হলো এই সাম্প্রতিক বাগযুদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর বছরের পর বছর ধরে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং এর বিপরীতে ইরানি জনগণের অবিচল প্রতিরোধের যে সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, বর্তমান এই ঘটনা তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মার্কিন নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে প্রায়শই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে, বিশেষ করে ইরানকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকে। অপরদিকে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বও তাদের জাতীয় মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষায় এ ধরনের অবমাননাকর মন্তব্যের অত্যন্ত কড়া ও যৌক্তিক জবাব দিতে কখনোই পিছপা হন না।
ইরানের নেতারা বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তাদের অর্থনীতিতে সাময়িক চাপ সৃষ্টি করলেও তা ইরানিদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে ও আত্মনির্ভরশীল হতে শিখিয়েছে। খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিখাতে ইরান নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে।
ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে যখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য সহায়তার জন্য নির্ভর করে, তখন ট্রাম্পের মন্তব্যের অসারতা খুব সহজেই অনুমেয় বলে মনে করেন ইরানি বিশ্লেষকরা।
বাঘের গালিবাফের এই মন্তব্য মূলত বিশ্ববাসীর সামনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রকৃত চিত্রটি তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরানের আপসহীন, আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানকেই আরও একবার সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে।