ইসরায়েলি এই প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের ধারাবাহিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে ইরানের বর্তমান শোকাবহ অথচ উত্তপ্ত পরিস্থিতি, লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে শোকাহত জনতার তীব্র প্রতিশোধস্পৃহার কথা।
শনিবার তেহরানের ঐতিহ্যবাহী ও সুবিশাল ইমাম খোমেনি (রহ.) মুসাল্লায় আয়োজিত এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠান দ্বিতীয় দিনে পদার্পণ করেছে। হিব্রু ভাষার এই গণমাধ্যমটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিজেদের প্রয়াত ও প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে এবং এক নজর দেখতে এখনো ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ স্রোতের মতো রাজধানী তেহরানের দিকে ছুটে আসছেন।
এই বিশাল জনসমুদ্রে অংশগ্রহণকারী লাখো মানুষের কণ্ঠে কেবলই স্বজন হারানোর বেদনা নয়, বরং চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার জোরালো দাবি প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে।
উপস্থিত জনতা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও আবেগময় কণ্ঠে অনবরত ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগানে তেহরানের আকাশ-বাতাস ও রাজপথ প্রকম্পিত করে তুলছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
এই বিশাল শোকযাত্রার নেপথ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক তাৎপর্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইসরায়েলি চ্যানেল টুয়েলভ জানিয়েছে যে, এই অভাবনীয় জনসমাগম মূলত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, তাদের আদর্শিক দৃঢ়তা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্যের এক অনবদ্য প্রদর্শনী।
সাধারণ আপামর জনসাধারণের পাশাপাশি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বও এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সম্ভাব্য শত্রুদের প্রতি এবং বহির্বিশ্বকে তাদের শক্ত সামরিক অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন।
বিশেষ করে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর’ বা আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডারের একটি অত্যন্ত কড়া, আগ্রাসী ও তাৎপর্যপূর্ণ হুঁশিয়ারি ইসরায়েলি ওই প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে।
ওই জ্যেষ্ঠ কমান্ডার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ও হুংকারের সুরে বলেছেন, যেসব পশ্চিমা বা আঞ্চলিক পরাশক্তি বর্তমান এই শোকের সুযোগ নিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করার দুঃস্বপ্ন দেখছে, তাদের সেই হীন স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়িত হবে না; বরং তারা সেই ব্যর্থ স্বপ্ন নিজেদের সঙ্গেই চিরকালের জন্য কবরে নিয়ে যাবে।
ইসরায়েলি এই সংবাদমাধ্যমটি তাদের সুদীর্ঘ প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান চরম উত্তেজনাকর, সংবেদনশীল ও সংঘাতময় ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আয়োজিত এই বিশাল ও আবেগঘন শোকানুষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো অত্যন্ত নিবিড়, সতর্ক ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতার এই চিরবিদায়লগ্নে সাধারণ মানুষের এই বিপুল ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং প্রকাশ্য রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক নীতি নির্ধারণে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে, এই শোকযাত্রা থেকে যে ধরনের সামরিক প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা আগামী দিনগুলোতে ওই অঞ্চলে নতুন করে কোনো বড় ধরনের সংঘাত বা সামরিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ও পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর বিশ্লেষণ ও চুলচেরা পর্যালোচনা চলছে।
ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, উম্মাহর শহীদ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই ঐতিহাসিক বিদায় ও রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠান মোট ছয় দিন ধরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য, ধর্মীয় আচার ও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে পালিত হবে।
এই সুদীর্ঘ সময়ে কেবল ইরানের ভেতরেই নয়, প্রতিবেশী ও মিত্র রাষ্ট্র ইরাকেও বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও রুট অনুযায়ী, পবিত্র এই মরদেহ ইরান এবং ইরাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ, পবিত্র ও ঐতিহাসিক শহরগুলো ধীরগতিতে প্রদক্ষিণ করবে, যেখানে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো অনুসারী তাদের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি পরম শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পাবেন।
দুই দেশের এই দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও আবেগময় পথপরিক্রমা শেষে আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে এক চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা ও লাখো জনতার উপস্থিতিতে এই মহান নেতাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার মধ্য দিয়ে এই শোকযাত্রার সমাপ্তি ঘটবে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই বিদায় অনুষ্ঠানটি নিছক কোনো রাষ্ট্রীয় নেতার জানাজা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষ করে ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের প্রতি তেহরানের আপসহীন, অনড় ও প্রতিরোধমূলক মনোভাবের এক বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক মহড়া হিসেবেই গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।