ইরানি ভূখণ্ডে তৃতীয় দফায় রাতভর ভয়াবহ বিমান হামলার পর ওয়াশিংটনে এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে তিনি দাবি করেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে 'নব্বই শতাংশ শেষ হয়ে গেছেন' এবং তিনি চরম মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছেন।
মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই চাঞ্চল্যকর বক্তব্য ও যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান বৈরিতাকে এক নজিরবিহীন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক যৌথ সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা সামরিক সক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। তিনি দাবি করেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী হামলার মুখে দেশটির শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডাররা একে একে নিহত হয়েছেন।
এর ফলে দেশটির চেইন অফ কমান্ড বা সামরিক নেতৃত্ব পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, এই মুহূর্তে ইরানের কার্যকর কোনো নৌবাহিনী অবশিষ্ট নেই এবং তাদের বিমানবাহিনীও সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
পারমাণবিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় নিয়োজিত দেশটির আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও এই হামলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। সামগ্রিকভাবে দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এখন চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নাম উল্লেখ করতে গিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন, চলমান এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান নেতাদের চিরতরে নির্মূল করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা খোমেনির মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেন, যা মূলত বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে বোঝাতে গিয়ে ভুলবশত উচ্চারিত হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৮৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অন্যদিকে, বিগত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর এক যৌথ বিমান হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ট্রাম্প মূলত সেই ঘটনার সূত্র ধরেই দাবি করেন যে, খামেনির মৃত্যুর পর দেশের দায়িত্ব নেওয়া তার পুত্র মোজতবা খামেনিও গত চার মাসের যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক হামলায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে আর কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
ওই নির্দিষ্ট দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় তার পিতা আলি খামেনি নিহত হন এবং মোজতবা নিজে মারাত্মকভাবে আহত হন বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর পাওয়া যায়। দীর্ঘ চার মাস ধরে রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে তার এই রহস্যজনক অনুপস্থিতি, শারীরিক অসুস্থতার প্রকৃত অবস্থা এবং তিনি বর্তমানে কোথায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এবং ইরানের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র কৌতুহল ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই জল্পনা-কল্পনাকে আরও উস্কে দিল। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ক্ষয়ক্ষতির একটি সুনির্দিষ্ট খতিয়ান তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক বাহিনীর যে সামান্য কিছু প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল, তা-ও এই দফায় পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। পারস্য উপসাগরে ইরানের নৌবাহিনীর যে ১৫৯টি যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক জলযান ছিল, সেগুলোর সিংহভাগকেই যৌথ বাহিনী সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।
একই সঙ্গে দেশটির বিমানবাহিনীর প্রায় ২০০টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরানের এখন কোনো কার্যকরী রাডার ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কিংবা নতুন করে আধুনিক অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত যোগ্যতা অবশিষ্ট নেই।
দেশটির সার্বিক সামরিক শক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতিমধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, যার ফলে তারা বিশ্ব মানচিত্রে একটি শক্তিহীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্ববাসীকে জানান যে, মাত্র চার মাস আগের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ইরানের সঙ্গে বর্তমান ইরানের কোনো মিল নেই।
চার মাস আগের তুলনায় তারা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং একটি অত্যন্ত দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত চার মাসে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক ও বিধ্বংসী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানকে কার্যত আধুনিক যুগ থেকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের একটি অংশ হিসেবে দেখছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।