ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের নজিরবিহীন ও আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েলে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচন।
ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তীব্র কৌতূহল ও ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে কার্যত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোট সরকারের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
পূর্ববর্তী নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দল একক দল হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক আসনে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায়, তাকে সরকার টিকিয়ে রাখতে দেশের উগ্র ডানপন্থী ও চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে বাধ্য হতে হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলশ্রুতিতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম চরমপন্থী ও উগ্রবাদী এক যৌথ সরকার গঠিত হয়েছিল। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য ও রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল ফিলিস্তিনিদের বৈধ ভূখণ্ড দখল করা এবং তাদের মৌলিক ও আন্তর্জাতিক অধিকার থেকে চরমভাবে বঞ্চিত করা।
ফলে এই নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর উগ্র রাজনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে জনগণের এক বড় রায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ, যা স্থানীয়ভাবে ‘নেসেট’ নামে সমধিক পরিচিত, তার কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেসেটের বর্তমান মেয়াদের আর মাত্র অল্প কিছু নির্ধারিত অধিবেশন বাকি রয়েছে। ফলে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী শুক্রবারই নেসেট সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া হবে। তবে সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তের এই অল্প সময়টুকুকে নেতানিয়াহুর জোট সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
তারা বিদায় নেওয়ার আগেই সংসদে কিছু অত্যন্ত বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর আইন তড়িঘড়ি করে পাস করিয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। মনে করা হচ্ছে, এই বিতর্কিত আইনগুলোর মাধ্যমে তারা আসন্ন নির্বাচনে দেশের সাধারণ ভোটারদের আবেগ ও সমর্থন নিজেদের পক্ষে টানার একটি শেষ চেষ্টা করছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যখন এই ধরনের সমীকরণ চলছে, তখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের আশঙ্কা, নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত নিজেদের ভোট ব্যাংক ভারী করতে এবং কট্টরপন্থী নাগরিকদের সন্তুষ্ট করতে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের পৈতৃক ভূখণ্ড জোরপূর্বক দখল করার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
একই সাথে সেখানে নতুন নতুন অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের গতি তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূমিতে এই ধরনের একতরফা আগ্রাসন ও উচ্ছেদ অভিযানের ফলে স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর সহিংসতা ও নিপীড়ন মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে বলে দ্য গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদনে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জনমত জরিপের দিকে তাকালে দেখা যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন চরম সংকটের মুখোমুখি।
দেশের প্রধান প্রধান জরিপ ও রাজনৈতিক সমীক্ষাগুলো ইঙ্গিত করছে যে, এবারের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ৭৬ বছর বয়সী এই দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রনায়ক সম্ভবত তার প্রধানমন্ত্রিত্ব হারাতে যাচ্ছেন। জনগণের একটি বড় অংশ বর্তমান সরকারের যুদ্ধনীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতায় চরম অসন্তুষ্ট।
যদিও অতীত ইতিহাস বলে, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত চতুর ও কৌশলী রাজনীতিবিদ। এর আগেও একাধিকবার সমস্ত প্রতিকূল জনমত জরিপ এবং রাজনৈতিক পূর্বাভাসকে সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা প্রমাণিত করে তিনি অবিশ্বাস্যভাবে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন।
তাই এবারের নির্বাচনেও তিনি কোনো নতুন রাজনৈতিক চাল চালবেন কিনা, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। ইসরায়েলের এই আসন্ন নির্বাচন কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং ফিলিস্তিন সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের ক্ষেত্রেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।