মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান পুনরায় আঘাত করলে অতীতের চেয়ে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে, নেতানিয়াহু

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ পিএম

ইরান পুনরায় আঘাত করলে অতীতের চেয়ে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে, নেতানিয়াহু
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের চরম বৈরী দুই পরাশক্তি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপ বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান যদি এবার ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে কোনো ধরনের হামলা পরিচালনা করে, তবে তার জবাবে অতীতের যেকোনো লড়াই বা সামরিক প্রতিশোধের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী, বিধ্বংসী ও কঠোর আঘাত হানবে তেল আবিব।

 

তেহরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক উসকানি বা আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার বিষয়ে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করে দিতেই মূলত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই প্রচ্ছন্ন হুমকি বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমির ডিমোনা শহরে আয়োজিত এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইরানকে উদ্দেশ্য করে এই কড়া মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক বার্তা প্রদান করেন।

 

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজের দেশের অটল অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি তার ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, “সেই দিন এখন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে, যখন কেউ আমাদের দেশের ওপর বা আমাদের নাগরিকদের ওপর আঘাত হানতো আর আমরা তার জবাবে দ্বিগুণ শক্তিতে পাল্টা আঘাত হানতাম না।”

 

তার এই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত করে যে, বর্তমান ইসরায়েলি প্রশাসন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শত্রুপক্ষকে প্রতিরোধ করতে যেকোনো ধরনের চরম সামরিক নীতি গ্রহণে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।

 

যে ডিমোনা শহরে এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই শহরটির একদম নিকটবর্তী ও সুরক্ষিত এলাকাতেই অবস্থিত ইসরায়েলের অত্যন্ত গোপনীয় এবং নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টিত পারমাণবিক চুল্লি।

 

সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ইসরায়েলের কাছেই সর্বাধুনিক ও বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে প্রবল ধারণা ও দাবি করে আসছেন।

 

তবে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে আজ পর্যন্ত তাদের এই বিপুল পারমাণবিক শক্তির অস্তিত্বের কথা আন্তর্জাতিক মঞ্চে কোনোদিন আনুষ্ঠানিকভাবে যেমন স্বীকার করেনি, ঠিক তেমনিভাবে তা কখনো সরাসরি অস্বীকারও করেনি।

 

মূলত কৌশলগত কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শত্রু দেশগুলোকে পরমাণু যুদ্ধ বা আগ্রাসন থেকে বিরত রাখতে এবং সমগ্র অঞ্চলে একটি পারমাণবিক প্রতিযোগিতা এড়াতে শুরু থেকেই এই রহস্যময় ও ‘দ্ব্যর্থতাহীন’ সামরিক কৌশল কঠোরভাবে বজায় রেখে চলেছে তেল আবিব।

 

চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ ও সমন্বিত সামরিক হামলার মাধ্যমে এই অঞ্চলের বর্তমান রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধাবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল।

 

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলা এই সংঘাতের তীব্রতা মাঝে কিছুটা স্তিমিত মনে হলেও, গত সপ্তাহ থেকে নতুন করে তৈরি হওয়া কিছু সমীকরণের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আবার চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

তবে অত্যন্ত আশ্বস্তের বিষয় হলো, এবারের নতুন করে শুরু হওয়া এই কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার পারদ চড়লেও এখন পর্যন্ত ইসরায়েল এবং ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সরাসরি কোনো সম্মুখ সমর বা একে অপরের মূল ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মতো বড় ধরনের কোনো সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটেনি।

 

কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে এই সাময়িক নীরবতা ভেঙে পরিস্থিতি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত না করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ইরান।

 

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী বিভিন্ন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সরাসরি পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে তেহরানের নির্দেশে তাদের সামরিক বাহিনী পারস্য উপসাগরে অবস্থিত অত্যন্ত সংবেদনশীল মার্কিন নৌ ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

 

মার্কিন সামরিক প্রশাসনের নতুন যেকোনো সম্ভাব্য হামলার আগাম জবাব দিতে এবং ওয়াশিংটনকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন কৌশলগত দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, রসদ সরবরাহ কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও রকেট হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর বা আইআরজিসি।

 

পরাশক্তিগুলোর এই বিপজ্জনক শক্তি প্রদর্শন ও পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শান্তিতে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

 

- রয়টার্স