মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি তেহরান নয়, বরং তেল আবিব- ওমান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি তেহরান নয়, বরং তেল আবিব- ওমান
ছবি : Collected

দীর্ঘদিন ধরে চলমান মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সাহসী অবস্থান গ্রহণ করেছে ওমান। দেশটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি কোনোভাবেই তেহরান থেকে আসছে না, বরং এই চরম হুমকির মূল উৎস হলো তেল আবিব।

 

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই অত্যন্ত জোরালো মত প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ওমান বরাবরই একটি নিরপেক্ষ এবং মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।

 

তাই এমন একটি শান্তিকামী রাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিকের মুখ থেকে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের নীতির এমন কঠোর সমালোচনা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং এটিকে আঞ্চলিক কূটনীতির একটি বড় বাঁক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মেহর নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে পার্স টুডে জানিয়েছে যে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আঞ্চলিক নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

 

এই আলোচনায় তিনি পারস্য উপসাগর এবং এর সংলগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাধাহীন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেন। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

 

বদর আল-বুসাইদি জোর দিয়ে বলেন, এই সমুদ্রপথে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের স্বাধীন ও নিরাপদ চলাচলের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর ও সর্বজনীন ব্যবস্থা অর্জন করা এখন সময়ের দাবি।

 

আর এই লক্ষ্য অর্জনে কেবল একক কোনো প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, বরং ইরানসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এবং সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করাকে তিনি নিজেদের একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

পারস্য উপসাগরের বর্তমান নিরাপত্তাহীনতা ও উত্তেজনার পেছনের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বদর আল-বুসাইদি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। প্রচলিত পশ্চিমা ধারণার ঠিক বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তার জন্য বর্তমানে যে সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক হুমকিগুলো বিরাজ করছে, তা এই অঞ্চলের ভেতরের কোনো দেশ বা অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে উদ্ভূত হচ্ছে না।

 

তার মতে, এই অঞ্চলের বাইরের বিভিন্ন পরাশক্তি এবং রাষ্ট্রের একতরফা ও আধিপত্যবাদী সিদ্ধান্ত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যকলাপই এই পরিস্থিতিকে এতটা জটিল করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই তিনি সরাসরি তেল আবিবের দিকে আঙুল তুলেছেন।

 

তার এই সুস্পষ্ট মন্তব্যের মাধ্যমে ওমান প্রকারান্তরে এটাই বুঝিয়ে দিল যে, ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি ও সামরিক কৌশলই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে।

 

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে কেবল আঞ্চলিক দেশগুলো নয়, বরং বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও অত্যন্ত গঠনমূলক অথচ কড়া সমালোচনা করেছেন বদর আল-বুসাইদি। তিনি মনে করেন, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর পুরোনো কূটনৈতিক সমীকরণগুলো নতুন করে হিসাব করার সময় এসেছে।

 

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করে বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যে নতুন ও রূঢ় কৌশলগত বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাস করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর পরাশক্তিগুলোর অন্ধ অনুকরণ করতে রাজি নয়, বরং তারা নিজেদের কৌশলগত নিরাপত্তা ও স্বাধীন আঞ্চলিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চায়।

 

বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে বদর আল-বুসাইদি সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সাথে ইরানের যে প্রত্যক্ষ ও ভয়ংকর সামরিক সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি এই যুদ্ধকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি চরম ‘বিপর্যয়কর’ ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ওই সম্মিলিত সামরিক অভিযানটি ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি, কারণ এর পেছনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রকার পূর্বানুমোদন বা আইনি বৈধতা ছিল না।

 

সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চালানো এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে আক্রমণকারী দেশগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত কোনো কৌশলগত লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি।

 

উল্টো এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ওমানের মতো একটি পরিপক্ব কূটনৈতিক দেশের এমন ভারসাম্যপূর্ণ অথচ তীক্ষ্ণ বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, বলপ্রয়োগ ও সামরিক আগ্রাসনের নীতি পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমেই কেবল মধ্যপ্রাচ্যে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

 

- পার্সটুডে