মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের রহস্যময় পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে ট্রাম্পের আকস্মিক হামলার হুমকি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

ইরানের রহস্যময় পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে ট্রাম্পের আকস্মিক হামলার হুমকি
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত বর্তমানে এক অভূতপূর্ব এবং চরম অনিশ্চিত পর্যায়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উভয় দেশের মধ্যে হামলা এবং পাল্টা হামলার যে ভীতিকর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

 

পরিস্থিতি এতটাই জটিল ও পরিবর্তনশীল রূপ ধারণ করেছে যে, আগামী মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা আগে থেকে অনুমান করা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্যও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

ঠিক এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও চরম অনিশ্চয়তার আবহাওয়ার মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সরাসরি ইরানের অত্যন্ত গোপনীয় ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত রহস্যময় ‘পিকঅ্যাক্স’ পাহাড়ে সামরিক হামলা চালানোর প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক ও সরাসরি হুমকির পর থেকে ইরানের এই বিশেষ পারমাণবিক কমপ্লেক্সটির বর্তমান অবস্থা এবং এর পেছনের মূল রহস্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

 

পিকঅ্যাক্স পাহাড়টি মূলত ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি অত্যন্ত দুর্গম ও সুরক্ষিত এলাকা। সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে এটি ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে মোড়া একটি পারমাণবিক স্থাপনা।

 

আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই পাহাড়ের একেবারে গভীরে অত্যন্ত সুকৌশলে দুটি বিশালাকার সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্থাপনাটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান ও জটিল নির্মাণশৈলী।

 

মাটির এতটাই গভীরে এই সুড়ঙ্গগুলো অবস্থিত যে, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আধুনিক বোমা নিক্ষেপ করেও এই পারমাণবিক স্থাপনাটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছেন শীর্ষ সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের এই অতি গোপনীয় পারমাণবিক স্থাপনাটি মূলত কঠিন গ্রানাইট পাথরের কয়েকশ মিটার গভীরে তৈরি করা হয়েছে।

 

যেকোনো ধরনের বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং শক্তিশালী বিমান হামলা থেকে নিজেদের সংবেদনশীল পারমাণবিক কর্মসূচিকে সুরক্ষিত রাখতেই প্রকৃতি এবং প্রযুক্তির এমন এক অভিনব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে তেহরান।

 

অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ফেললেও যেন সেই বোমার ধ্বংসাত্মক প্রভাব মাটির নিচে থাকা মূল স্থাপনা পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এই পিকঅ্যাক্স কমপ্লেক্সটির নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও সংবাদ ওয়েবসাইট আল-মনিটরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এই পাহাড়টির ওপর কড়া নজরদারি চালিয়ে আসছে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে সেখানে একটি গোপন ও অঘোষিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা তৈরি করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

গোয়েন্দাদের দাবি, তেহরান মূলত ভবিষ্যৎ পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে নিজেদের ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা’ হিসেবে এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটিকে ব্যবহার করতে চায়। অন্যদিকে, ইরান বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে আসছে।

 

২০২০ সালে যখন প্রথম পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে এই পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন থেকেই তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হচ্ছে যে, এই স্থাপনাটিতে কোনো প্রকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা হবে না; বরং এখানে শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে উন্নত ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করার কাজ পরিচালিত হবে।

 

তবে ইরানের এই আশ্বাসে বিন্দুমাত্র আস্থা রাখতে নারাজ মার্কিন প্রশাসন। গতকাল গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে পিকঅ্যাক্স পাহাড় নিয়ে সরাসরি কথা বলেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, “আমরা খুব দ্রুত পিকঅ্যাক্স পাহাড়ে হামলা চালাতে যাচ্ছি।

 

ইরানিদের স্পষ্টভাবে বলে দিন তারা যেন এর জন্য প্রস্তুত থাকে। আমরা পিকঅ্যাক্সের ওপর অত্যন্ত কাছ থেকে ও গভীরভাবে নজর রাখছি। যদিও এই মুহূর্তে সেখানে আমরা বড় ধরনের কোনো কার্যক্রম দেখতে পাচ্ছি না। তারা মূলত তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম খুব একটা ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারছে না।

 

যখনই আমরা তাদের এই ধরনের কোনো গোপন কার্যক্রমের কথা শুনতে পাই, আমরা সাথে সাথেই সেটি উড়িয়ে দেই। যে কারণে তারা এখন পিকঅ্যাক্স নিয়ে জনসমক্ষে কোনো কথা বলতে চায় না। কিন্তু আমি নিশ্চিত করছি যে, পিকঅ্যাক্সে আমরা সম্ভবত খুব শিগগিরই একটি বিধ্বংসী হামলা চালাব।”

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন সরাসরি ও সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলার হুমকির পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক নতুন আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই ইরানের ভূখণ্ডের এত গভীরে থাকা কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে তা কেবল এই দুই দেশের সামরিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় এক ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এখন গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই কড়া হুঁশিয়ারি কি কেবলই মনস্তাত্ত্বিক চাপের কোনো রাজনৈতিক কৌশল, নাকি এর পেছনে সত্যিকারের কোনো সামরিক অভিযানের নীল নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে।

 

- আল জাজিরা