বুধবার, পনেরোই জুলাই, দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ বিবৃতির মাধ্যমে এই চরম উত্তেজনাকর তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমনিতেই যখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই নতুন স্নায়ুযুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মূলত হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন করে অবরোধ আরোপ এবং এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরপরই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পক্ষ থেকে এই কঠোর হুমকি দেওয়া হলো।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থায় প্রকাশিত ওই বিশেষ বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে, আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুবিধা যদি সবাই সমানভাবে ভোগ করতে না পারে, তবে কাউকেই এই সুবিধা পেতে দেওয়া হবে না।
তাদের এই বক্তব্যের কৌশলগত অর্থ বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ইরান মূলত তাদের মিত্র ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যদি সত্যিই এমনটি ঘটে, তবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম দুটি জ্বালানি পরিবহন পথ একই সঙ্গে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলবে। ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংকীর্ণ কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে অপরিহার্য এই প্রণালিটি মূলত লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।
সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি এবং বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের এক বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়ে থাকে। ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবরে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত সোমবার হুতিদের এক শীর্ষ নেতা প্রকাশ্যে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনের ভূখণ্ডে তাদের সামরিক হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তারা যেকোনো মুহূর্তে বাব-এল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত।
ওই নেতার দাবি, এই নৌপথটি বন্ধ করে দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দেবে এবং প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এরই মধ্যে গত সোমবার সৌদি আরব হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে আকস্মিক বোমা হামলা চালিয়েছে বলে হুতিদের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। এর তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ হিসেবে হুতি যোদ্ধারাও পাল্টা বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এই পাল্টাপাল্টি সামরিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে গত চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির কার্যত চরম অবসান ঘটল। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে সফল হামলা চালিয়ে হুতিরা আগেই প্রমাণ করেছে যে, বাব-এল-মান্দেব প্রণালি অবরুদ্ধ করে বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত করার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের যে সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, সেটি দুর্বল করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার ঠিক একদিন পরই ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এই নতুন ও বৃহত্তর অবরোধের হুমকি প্রদান করল।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি, গত এক সপ্তাহে ইরান আন্তর্জাতিক জলসীমায় অন্তত সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় প্রায় এক ডজন নিরীহ নাবিক নিহত, নিখোঁজ অথবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন বলে ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে।
এই ক্রমাগত হামলার জবাবে মঙ্গলবার রাতে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে যে, তারা হরমুজ প্রণালির আশপাশে এবং ইরানের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অবস্থিত কয়েক ডজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় টানা সাত ঘণ্টা ধরে ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তাদের অবস্থানে অনড় থেকে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের অশুভ তৎপরতা ও সামরিক আগ্রাসন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য বন্ধই থাকবে।
উল্লেখ্য, এই নতুন সংঘাত শুরুর আগে সমগ্র বিশ্বের প্রায় বিশ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হতো। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ইরান পাল্টা দাবি করেছে যে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো বিমান হামলার উপযুক্ত জবাব হিসেবে তারা ইতিমধ্যে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের বেশ কয়েকটি কৌশলগত স্থাপনায় সফল সামরিক হামলা চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ফ্রান্স ২৪-এর বরাত দিয়ে এই সার্বিক সংঘাতময় পরিস্থিতি ও অভাবনীয় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।