বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপসাগরীয় তিন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

উপসাগরীয় তিন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের তিনটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একযোগে ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।

 

বুধবার মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে চালিত এই পাল্টা হামলাকে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলা ও কঠোর নৌ-অবরোধের সরাসরি জবাব হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

 

একই সঙ্গে ইরান ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন আগ্রাসন সম্পূর্ণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল জলপথ 'হরমুজ প্রণালি' সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এই নজিরবিহীন সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।

 

আকস্মিক এই হামলার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় অবরোধের কারণে ইরানের নিজস্ব তেল ও গ্যাস রপ্তানি প্রক্রিয়া বর্তমানে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।

 

এরই পরিপ্রেক্ষিতে তারা ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের জ্বালানি সরবরাহের পথও অবরুদ্ধ করে দেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, এই অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির করিডোর হয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, না হলে কারও জন্যই তা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

 

অন্যদিকে, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ওয়াশিংটনের এই আগ্রাসী নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অবরোধ মূলত গত মাসে পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'ইসলামাবাদ স্মারক' শান্তি চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন ও ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

 

উভয় পক্ষের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত পঞ্চম দিনে পদার্পণ করার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা ইরানের উপকূলবর্তী এলাকা এবং প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত এক ডজনেরও বেশি কৌশলগত ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।

 

মার্কিন এই বিধ্বংসী হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির অন্যতম প্রধান বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস, কিশ দ্বীপ এবং বন্দর ইমাম খোমেনিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বড় ধরনের একাধিক বিস্ফোরণ ঘটেছ, যার ফলে স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

মার্কিন বাহিনীর এই আগ্রাসনের পরপরই বাহরাইনে সম্ভাব্য বিমান হামলার সতর্কসংকেত হিসেবে সাইরেন বেজে ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কুয়েত ও জর্ডান দাবি করেছে যে, তারা তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোন ও প্রজেক্টাইল সফলভাবে প্রতিহত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।

 

তবে এই দাবির বিপরীতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা ভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, আইআরজিসির ছোঁড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে অত্যন্ত সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

 

এই সামরিক উত্তাপের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তেহরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং প্রধান প্রধান যোগাযোগ সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে আরও বড় পরিসরে বিধ্বংসী সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হবে।

 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে জানিয়েছেন, বিগত এক সপ্তাহে ইরানি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে সাতটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে।

 

মার্কিন সামরিক নথির বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, এসব হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১২ জন বেসামরিক সাধারণ নাবিক নিহত, নিখোঁজ অথবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। যার মধ্যে গত মঙ্গলবার ওমান উপকূলে একটি নরওয়েজিয়ান তেল ট্যাংকারে শক্তিশালী বিস্ফোরণ এবং কুয়েতের একটি নৌযান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন বিমান হামলার কারণে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সেখানে অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী সংঘাতের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করে ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

 

দেশটির ঐতিহাসিক দিমোনা শহর থেকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিভিশন ভাষণে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ইসরাইলের ভূখণ্ডে বা সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো ধরনের আঘাত এলে তার দাঁতভাঙা ও উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

 

নেতানিয়াহু দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ইসরাইলের ওপর হামলা চালিয়ে শত্রুপক্ষ অনায়াসে পার পেয়ে যাবে-এমন দিন এখন সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আল আরাবিয়ার বরাত দিয়ে এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ও সংঘাতময় পরিস্থিতির খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

 

- আল আরাবিয়া