মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে টানা চতুর্থ দিনের মতো তীব্র সামরিক সংঘাত ও পাল্টা হামলা চলার আবহেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এমন চরম বার্তা এলো।
ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এখন এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ফক্স নিউজের ওই বিশেষ অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন যে, আগামী সপ্তাহে ইরানের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় ও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
তেহরান যদি অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে এসে একটি টেকসই সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগ সেতু ধ্বংস করে দেবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জ্বালানি খাতের সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুগুলোকে আপাতত শেষের জন্য রেখে দেওয়া হলেও, চূড়ান্ত পর্যায়ে মার্কিন বাহিনী ইরানের সম্পূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করবে না।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানি প্রতিনিধিদের কাছে এই কড়া বার্তা ইতিমধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে ইরান যেন দ্রুত একটি চুক্তি সম্পন্ন করে, অন্যথায় তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
এই তীব্র বাকযুদ্ধের সমান্তরালে দুই দেশের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা মাঠপর্যায়েও চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী সব কার্গো জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক বা ফি আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে একটি বৃহৎ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করার ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন।
তবে এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের নির্দেশনায় ইরানি ভূখণ্ডে টানা সাত ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে ইরানের প্রধান বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় কঠোর নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে মার্কিন প্রশাসন।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী ইরানের ডজনখানেক সামরিক ঘাঁটিতে এই হামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দেওয়া।
অন্যদিকে মার্কিন এই আগ্রাসনের জবাবে ইরানও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার দাবি করেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বাম্পুর শহরের একটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত সাতজন ইরানি সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আইআরআইবি জানিয়েছে, তেহরান জর্ডান, কুয়েত এবং বাহরাইনে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও এখন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে বেসামরিক অবকাঠামো ও সেতু উড়িয়ে দেওয়ার এই হুমকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতিপূর্বে গত এপ্রিল মাসেও ট্রাম্প যখন একই ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন, তখন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সতর্ক করেছিলেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ১৯৪৯ সালের ঐতিহাসিক জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ আকাঙ্খার সময় সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য কোনো বেসামরিক স্থাপনা বা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো স্পষ্টত একটি যুদ্ধাপরাধের শামিল।
উল্লেখ্য, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গত এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো দেশটির সব সমুদ্রবন্দরের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী সেই অবরোধের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রায় একশত বাণিজ্যিক জাহাজের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল এবং অন্তত চারটি জাহাজকে সম্পূর্ণরূপে অচল করে দিয়েছিল।
পরবর্তীতে গত জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলে এই অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও শুল্কায়নকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধ তৈরি হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরান পুনরায় মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে অচলাবস্থার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামও হু হু করে বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করছে।