বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২৬
৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের বশ্যতা মানতে নারাজ তেহরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

ট্রাম্পের বশ্যতা মানতে নারাজ তেহরান
ছবি : Collected

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের ১৩৬তম দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক অভাবনীয় পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইরানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি চড়া শুল্ক আদায়ের প্রস্তাব দেন।

 

কিন্তু তার এই বহুল আলোচিত পরিকল্পনাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়নি। আরব মিত্রদের তীব্র আপত্তি ও প্রতিবাদের মুখে ১৩৭তম দিনে এসে তিনি তার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে আসেন এবং জানান যে কোনো শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে না।

 

আকস্মিকভাবে অবস্থান পরিবর্তনের এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস বর্তমানে কতটা দিশেহারা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। যে সামরিক অভিযানটিকে প্রাথমিকভাবে চার থেকে ছয় সপ্তাহের একটি অত্যন্ত সহজ ও পরিচ্ছন্ন অভিযান বলে ধারণা করা হয়েছিল, তা এখন বিশতম সপ্তাহে গড়িয়ে এক চরম জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তাৎক্ষণিক খেয়ালখুশি এবং আবেগনির্ভর রণকৌশল এই সংকট সমাধানে কোনো কাজেই আসছে না। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বমঞ্চে একতরফাভাবে পেশিশক্তি প্রদর্শনকে যিনি এক প্রকার অভ্যাসে পরিণত করেছেন, সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবার তেহরানে এমন এক অনড় প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা সহজে মাথা নোয়াতে একেবারেই নারাজ।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া বার্তা দিয়ে বা শুল্ক আরোপের হুমকি ছুড়ে দিয়ে যে এই ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়, তেহরান প্রতিনিয়ত তা প্রমাণ করে চলেছে। এ প্রসঙ্গে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ওয়ালি নাসর মত প্রকাশ করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবার এমন এক দেশের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা তার বেঁধে দেওয়া নিয়মে খেলতে রাজি নয়।

 

সাধারণত ট্রাম্পের নীতি হলো, প্রতিপক্ষকে প্রথমে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং তার দেওয়া সামান্য ছাড়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এই নীতি সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

 

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেইন পলিসি বিভাগের পরিচালক সুজান ম্যালোনিও মনে করেন, মার্কিন প্রশাসনের আক্রমণাত্মক কূটনীতি মূলত ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে গত চার দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এটি সহজেই অনুমেয় ছিল যে, তেহরান এত সহজে মার্কিন ফাঁদে পা দেবে না।

 

আমেরিকান গবেষণা সংস্থা জিসা-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন হ্যানাহ মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে একটিমাত্র প্রবল ধাক্কায় গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে মার্কিন প্রশাসন এক ঐতিহাসিক ভুল করেছে।

 

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে গড়ে ওঠা ইরানের সুদৃঢ় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে এবং মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখানো হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে।

 

হোয়াইট হাউসের ধারণা ছিল, মার্কিন বিমান হামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কড়া বার্তার আঘাতেই ইরানের বিপ্লবী সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের চারপাশে এমন কোনো বলিষ্ঠ জাতীয় নিরাপত্তা দল ছিল না, যারা এই ধারণার অসারতা তুলে ধরতে পারতেন।

 

অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তাদের মতামতকে উপেক্ষা করে ভুল সিদ্ধান্তগুলোকেই বিনাপ্রশ্নে গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ভেঙে পড়া দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটিও কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ দেখাতে পারেনি। ষাট দিনের ওই সাময়িক চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।

 

কিন্তু সেটি ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি সামলাতে মার্কিন প্রশাসন এখন অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত। প্রেসিডেন্ট পুনরায় সামরিক পন্থায় ফিরে গিয়ে হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ইরানের একটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার নিকটবর্তী সুরক্ষিত অঞ্চলে বড়সড় হামলার হুমকি দিয়েছেন।

 

তবে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিপক্ষে থাকায়, যুদ্ধের শুরুর দিকের মতো বেপরোয়া পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ এখন আর হোয়াইট হাউসের হাতে নেই। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন একটি অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়েছেন।

 

তিনি এমন এক জেদি প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে প্রকারান্তরে পুরো বিশ্ববাণিজ্যকেই জিম্মি করে ফেলেছে। বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।

 

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইরানীয় স্টাডিজের পরিচালক আব্বাস মিলানি বিষয়টিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ইরানের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল নেই; পুরোটাই পরিচালিত হচ্ছে সহজাত প্রবৃত্তির ওপর নির্ভর করে।

 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, হোয়াইট হাউস এই শাসনব্যবস্থার আসল চরিত্র কখনোই অনুধাবন করতে পারেনি। ইরান সাধারণ কোনো দেশ নয়; তারা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং নিজেদের ভৌগোলিক আধিপত্য বজায় রাখতে অভাবনীয় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে সক্ষম। দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থা তাই সহসাই কাটছে না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

 

- নিউ ইয়র্ক টাইমস