শুক্রবার, জুলাই ১৭, ২০২৬
২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওমান ও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন রাডার ধ্বংসের দাবি ইরানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম

ওমান ও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন রাডার ধ্বংসের দাবি ইরানের
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করে ওমান এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক রাডার স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরান।

 

দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই বড় ধরনের সামরিক অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আঞ্চলিক আধিপত্য ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের এটি ছিল ইরানের ত্রয়োদশ বা ১৩তম দফার ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্ট হামলা।

 

আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের এই প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অব্যাহত থাকবে।

 

প্রকাশিত বিশদ তথ্য অনুযায়ী, ওমানের ঘানিম অঞ্চলে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমান নিয়ন্ত্রণ রাডার এবং হরমুজ প্রণালির একটি দুর্গম পাথুরে এলাকায় স্থাপিত মার্কিন সামুদ্রিক নজরদারি রাডারকে লক্ষ্য করে এই নিখুঁত ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়।

 

আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে দাবি করেছে, এই দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত স্থাপনা ধ্বংসের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের আকাশ ও সমুদ্রসীমায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার ঘটনা কেবল দুটি রাডার স্টেশন ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে ইরান বিশ্বমঞ্চে নিজের অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার আঘাত হানার ক্ষমতার এক কঠোর বার্তা প্রদান করল।

 

এই রাডার হামলার সমান্তরালে ইরান দূরবর্তী সিরিয়াতেও আরেকটি বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দেয়। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সিরিয়ার আল-তানফ সামরিক ঘাঁটিতে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিশেষ অভিযান বাহিনীর বা স্পেশাল অপারেশনসের প্রধান কমান্ড সেন্টারেও সফল ও জোরালো হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।

 

তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের ইরানশাহর এলাকায় সম্প্রতি ইরানি সেনা সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার যে ঘটনা ঘটেছিল, এটি মূলত তারই একটি সরাসরি ও কঠোর পাল্টা প্রতিশোধ।

 

এই হামলার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্যের ওপর হামলা চালানো হলে তার জবাব অত্যন্ত কঠোরভাবে দেওয়া হবে, এমনকি তা যদি দেশের সীমানার বাইরে অবস্থিত কোনো সুরক্ষিত মার্কিন ঘাঁটিতেও হয়।

 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের নতুন ও নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও পরিবাহিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই সংকীর্ণ ও সংবেদনশীল জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

 

আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি এখনও ইরানি নৌবাহিনীর পূর্ণ ও নিশ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ওপর ভিত্তি করে তেহরান ওয়াশিংটনকে এক চরম বার্তা দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর নতুন করে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা একতরফা হামলা অব্যাহত রাখে, তবে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে বিশ্বের কোনো দেশে তেল কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমান, সিরিয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই ত্রিমুখী সামরিক তৎপরতা ও কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের এই দাবির বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ জানানো না হলেও, এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

 

ইরানের এই নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি ও সরাসরি সামরিক অভিযান বিশ্ব অর্থনীতিতে বিশেষ করে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে একটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছে বিশ্ব সম্প্রদায়।

 

- আল জাজিরা