বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের সমগ্র অবকাঠামো ধ্বংসের কড়া হুঁশিয়ারি দিল তেহরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

ইরানে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের সমগ্র অবকাঠামো ধ্বংসের কড়া হুঁশিয়ারি দিল তেহরান
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অভ্যন্তরীণ কোনো লক্ষ্যবস্তু বা কৌশলগত অবকাঠামোতে সামরিক হামলার হুমকি বাস্তবে রূপ দেওয়ার দুঃসাহস দেখায়, তবে তার পরিণতি হবে সমগ্র অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামরিক হুমকির কড়া জবাব দিয়ে তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, এমন কোনো আগ্রাসন চালানো হলে ইরান শুধু নিজেদের প্রতিরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সমগ্র অঞ্চলের অবশিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবকাঠামো সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

 

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক ফোরাম খাতাম আল আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে এই নজিরবিহীন ও চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বিবৃতিকে চলমান মার্কিন-ইরান সামরিক উত্তেজনার পারদে এক নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রা হিসেবে দেখছেন।

 

খাতাম আল আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রভাবশালী মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকারি এক বিশেষ সংবাদ ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই কঠোর বার্তা প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি অভিযোগ করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা ও চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আসছে।

 

তার দাবি, ওয়াশিংটন ক্রমাগতভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন করে চলেছে, যা সমগ্র অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য প্রধান হুমকিস্বরূপ। ইব্রাহিম জুলফিকারি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অপরাধী আমেরিকার এই আধিপত্যবাদী নীতি এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না।

 

আঞ্চলিক নিরাপত্তার নামে যুক্তরাষ্ট্র যে অযাচিত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে, তা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইরান কখনোই মেনে নেবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হরমুজ প্রণালির বিষয়েও তেহরানের অনড় অবস্থানের কথা জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেন এই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা।

 

তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, হরমুজ প্রণালি হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য একটি অবিচ্ছেদ্য ‘লাল রেখা’ বা রেড লাইন। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভূ-কৌশলগত জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রসহ যেকোনো বহিরাগত পরাশক্তির যেকোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হবে না।

 

যদি কোনো পশ্চিমা পরাশক্তি এই জলপথে নিজেদের নৌ-আধিপত্য বিস্তারের বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তবে ইরান তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সেই অপচেষ্টা প্রতিহত করবে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইরানের সার্বভৌম অধিকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি প্রকাশ্যে ইরানের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো লক্ষ্য করে সামরিক হামলা চালানোর যে প্রত্যক্ষ ও আগ্রাসী হুমকি দিয়েছেন, তার প্রেক্ষিতে ইব্রাহিম জুলফিকারির এই বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

 

এই প্রসঙ্গে জুলফিকারি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওই অপরিণামদর্শী হুমকি যদি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, তবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অকল্পনীয় রূপ ধারণ করবে।

 

তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন, বর্তমান বৈরী পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে যে সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোগুলো এখনো অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে, তা কেবলই ইরানের সর্বোচ্চ কৌশলগত ধৈর্য ও সংযমের কারণে।

 

কিন্তু এই সংযমকে যদি দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে আক্রমণ চালানো হয়, তবে তা হবে আক্রমণকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ভুল। হামলার শিকার হলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা আঘাতের ভয়াবহতা সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা দেন খাতাম আল আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ডের এই মুখপাত্র।

 

তিনি সতর্ক করে বলেন যে, যেকোনো চরম সংকটময় মুহূর্তে বা জাতীয় নিরাপত্তার ওপর অস্তিত্বশীল হুমকি এলে ইরান একচুলও পিছু হটবে না। যদি ওয়াশিংটন প্রথম আঘাত হানে, তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে যে ইস্পাতকঠিন পাল্টা আঘাত আসবে, তা শত্রুদের সমস্ত সামরিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেবে।

 

তিনি বলেন, সেই ধ্বংসাত্মক হামলায় আঞ্চলিক অবকাঠামোগুলো এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যে, সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব কোনোকালে ছিল বলেও কারও মনে হবে না। জুলফিকারি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এই প্রত্যাঘাত কখনোই কেবল সমপর্যায়ের বা আনুপাতিক হারে হবে না; বরং তা হবে আক্রমণকারীদের ধারণার চেয়েও বহুগুণ বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি বিস্তৃত এবং ইতিহাসের যেকোনো সামরিক সংঘাতের চেয়ে আরও বেশি বিধ্বংসী।

 

এই পাল্টা হামলা প্রতিপক্ষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন। ইরানের প্রখ্যাত রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির এই বিস্তারিত প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন সমগ্র বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য ভয়াবহ সামরিক সংঘাত ও এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে।

 

- তাসনিম নিউজ এজেন্সি