বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা নস্যাতে অর্থায়ন করছে ইসরাইল, জেডি ভ্যান্স

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা নস্যাতে অর্থায়ন করছে ইসরাইল, জেডি ভ্যান্স
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও বিস্ফোরক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান শান্তি আলোচনা এবং দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটাতে যে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে, তা নস্যাৎ করার জন্য ইসরায়েল পর্দার আড়াল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত একটি দেশের বিরুদ্ধে খোদ মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতার এমন প্রকাশ্য ও গুরুতর অভিযোগ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে রীতিমতো ঝড় তুলেছে।

 

জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব জো রোগানের একটি বিশেষ অনলাইন সম্প্রচার অনুষ্ঠানে দেওয়া এক দীর্ঘ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট এই চাঞ্চল্যকর দাবি করেন।

 

তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান অত্যন্ত সংবেদনশীল এই শান্তি প্রক্রিয়াকে চিরতরে বাধাগ্রস্ত করতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে একটি সুসংগঠিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই অন্তর্ঘাতমূলক প্রচারণার পেছনে কাজ করছে বিশাল অঙ্কের অর্থ, যার মূল উদ্দেশ্য হলো যেকোনো মূল্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষরকে আটকে দেওয়া এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আগের মতোই ধরে রাখা।

 

সাক্ষাৎকারে নিজের বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যক্তিগত আক্রমণের নেপথ্যের কারণও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন জেডি ভ্যান্স। তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি নির্দিষ্ট ও সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও হিংস্রভাবে তাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

 

এই আক্রমণকারী গোষ্ঠীটির অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্ফোরক তথ্য উন্মোচন করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণার সঙ্গে একসময় যুক্ত ছিলেন এমন এক সাবেক কর্মীর কাছ থেকে ওই গোষ্ঠীটি নিয়মিত অর্থ পাচ্ছে।

 

তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক দিক হলো, ওই সাবেক মার্কিন রাজনৈতিক কর্মী মূলত ইসরায়েল সরকারের নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী পক্ষের কাছ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।

 

অর্থাৎ, একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘ আর্থিক শৃঙ্খলের মাধ্যমে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের অপচেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জেডি ভ্যান্সের এই সরাসরি মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের মজবুত ও ঐতিহাসিক মিত্রতায় একটি সুস্পষ্ট ফাটলের বা গভীর অবিশ্বাসের ইঙ্গিত দেয়।

 

ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েল সবসময়ই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তির ঘোর বিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারকে ইসরায়েল নিজেদের জাতীয় অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

 

ঠিক এই কারণেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যেকোনো উদ্যোগ বা শান্তি চুক্তিকে তেল আবিব সবসময়ই চরম সন্দেহের চোখে দেখে। তবে, মিত্র দেশের সরকারের একাংশের বিরুদ্ধে মার্কিন শান্তি প্রক্রিয়ায় এমন সরাসরি অন্তর্ঘাতমূলক অর্থায়নের অভিযোগ এর আগে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব কমই দেখা গেছে।

 

মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিদেশি রাষ্ট্রের অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি নিয়ে জেডি ভ্যান্সের এই মন্তব্যের পর নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, সাবেক কোনো রাজনৈতিক কর্মীর মাধ্যমে বিদেশি অর্থ কীভাবে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে গভীর প্রশ্ন উঠেছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের শঙ্কার কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো, বিশেষ করে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি পরাশক্তির ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এমন একটি স্পর্শকাতর, বিরল ও গুরুতর অভিযোগ আসার পরও ইসরায়েলি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ জানানো হয়নি।

 

তেল আবিবের এই নীরবতা কূটনৈতিক মহলে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে একটি সুচিন্তিত কূটনৈতিক জবাব দেওয়ার জন্যই হয়তো ইসরায়েল সময় নিচ্ছে।

 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই শান্তি আলোচনা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটানোর একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ। যদি এই আলোচনা সফলতার মুখ দেখে, তবে তা পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে আমূল বদলে দিতে পারে।

 

কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্টের এই অভিযোগ যদি সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তবে তা মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং বিদেশি শক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের বিষয়টিকেই প্রকট করে তুলবে। শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরাও এখন এই অভিযোগের কারণে নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবেন।

 

পরিশেষে, জেডি ভ্যান্সের এই সাহসিকতাপূর্ণ বক্তব্য বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির পর্দার আড়ালে সবসময়ই ক্ষমতার এক অদৃশ্য ও জটিল লড়াই চলতে থাকে, যেখানে মিত্র ও প্রতিপক্ষের সীমারেখা অনেক সময়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

 

- আল জাজিরা