ওই অঞ্চলে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখতে তেহরান শেষ পর্যন্ত তীব্র প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাত দিয়ে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকামিনিয়া এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার বিষয়ে ইরানের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং আপসহীন। আইআরএনএর এক বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনায় হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব বলে যুক্তরাষ্ট্র যে ধারণা করছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুল।
উপকূল বা দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান যেমনই হোক না কেন, ওই জলসীমায় নিজেদের সার্বিক প্রভাব বজায় রাখার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তির আকস্মিক পতনের পর থেকেই ওই অঞ্চলের পরিস্থিতির অত্যন্ত দ্রুত ও বিপজ্জনক অবনতি ঘটে।
এর জেরে ইরান নতুন করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। গত শনিবার রাতে প্রণালিটি বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক নৌপথে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় বিশ শতাংশই এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে। স্বভাবতই এই উত্তেজনার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
বুধবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এরই মধ্যে বুধবার যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, বুধবার সকালে তারা ইরানের গ্রেটার তুনব দ্বীপে অবস্থিত উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল গুদাম এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে প্রথম দফায় ব্যাপক হামলা চালায়। এর প্রায় নয় ঘণ্টা পর দ্বিতীয় দফায় একাধিক শহরে আরও আক্রমণ চালানো হয়।
সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, এই সামরিক অভিযানে ইরানের প্রধান কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত বন্দর আব্বাসে নৌবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও আঘাত হানা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় বিশ্ববাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাই এই অভিযানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজতর হয়।
এমনকি, ইরানের খার্গ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি খালি তেলবাহী জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় সেটিকে লক্ষ্য করে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে।
এছাড়া পুনরায় নৌ অবরোধ শুরুর পর দুটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন ও একটি জাহাজ অচল করে দেওয়ার দাবিও করেছে তারা। মার্কিন এই ব্যাপক হামলার কড়া জবাব দিয়েছে তেহরানও। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
বিশেষ করে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির একটি আধুনিক রাডার ব্যবস্থা এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের একটি বড় সমাবেশ তাদের হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল বলে বাহিনীটি দাবি করেছে।
উদ্ভূত এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান এই সংঘাতকে নিজেদের ‘অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রথম দফার মার্কিন হামলার পর ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখা দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য।
এদিকে, যুদ্ধের ভয়াবহতা ক্রমেই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। ইরানের বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, বন্দর আব্বাসসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আহভাজ, কোনারাক, সিরিক ও কেশম এলাকাতেও ভারী বিস্ফোরণ ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী তেহরান থেকে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে খন্দাব শহরেও অন্তত দুটি বড় বিস্ফোরণ হয়েছে। সম্ভাব্য মার্কিন হামলা প্রতিহত করতে তেহরানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে মেহর বার্তা সংস্থা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আহভাজে শিশু ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে এমন একটি হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকায় মার্কিন হামলা হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত হাসপাতালটি খালি করে শিশু রোগীদের তাদের পরিবারসহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চলমান এই বহুমুখী সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লাখো মানুষ নিজেদের বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছেন। সংঘাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে ইরান ও লেবাননে।
বিশেষ করে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও চরম আকার ধারণ করিয়েছে। তাসনিম বার্তা সংস্থার মাধ্যমে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেবল জুলাই মাসেই মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৫ জন ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন।