এই লক্ষ্যে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীদের সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উচ্চপর্যায়ের অন্তত তিনটি নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন সূত্র এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এই কঠোর নির্দেশনার ফলে বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এক নতুন এবং অভাবনীয় চরম সংকট তৈরি হতে পারে বলে গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আঞ্চলিক একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নীতিনির্ধারক মহলে ইতোমধ্যে বিস্তারিত ও রুদ্ধদ্বার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনার পরপরই ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কাছে এই সতর্কবার্তা ও সামরিক নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর আগে কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে কোনো সংবাদ পরিবেশিত হয়নি।
তবে হুথিদের কাছে এই নির্দেশ ঠিক কী উপায়ে বা কোন সুরক্ষিত মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা চালানোর সরাসরি হুমকি প্রদান করেছিলেন, বিশ্লেষকদের ধারণা, ঠিক তার পরপরই হুথিদের এই জরুরি বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হুথি গোষ্ঠীর মুখপাত্রের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত অত্যন্ত কৌশলগত 'বাব আল-মান্দেব' প্রণালিতে ইতোমধ্যে ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে হুথি বিদ্রোহীরা।
হুথি গোষ্ঠীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চল হোদাইদাহ এবং এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী বিস্তৃত এলাকায় এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি বিপুল সংখ্যক আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন সামরিক বিমান বা ড্রোন মোতায়েন করেছে তারা।
ওই আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলকারী যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সব ধরনের সামরিক ও কৌশলগত প্রস্তুতি গোষ্ঠীটি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে তারা লোহিত সাগর পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য কেবল ইরানের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
হুথিদের ঘনিষ্ঠ ওই সূত্রটি আরও নিশ্চিত করেছে যে, ইয়েমেনে আগে থেকেই অবস্থান করা ইরানের ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরাই বাব আল-মান্দেব প্রণালি কখন বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, লোহিত সাগর এবং এর বাব আল-মান্দেব প্রবেশদ্বারে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বা সংঘাত বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। উল্লেখ্য, ইরানের আরেক কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই মূলত এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় যদি লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ কিংবা বন্দরগুলোতে হুথিরা নতুন করে আক্রমণ চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুটি তেল রপ্তানির রুট একসঙ্গে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে।
এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটকে এক মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে নিয়ে যাবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সামরিক সংঘাতের পরিধি ও ভয়াবহতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতির ওপর।
এদিকে ওই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মাঝে গত সোমবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি বিমানবন্দরে বোমাবর্ষণের জন্য সৌদি আরবকে সরাসরি দায়ী করে দেশটির ওপর আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথিরা।
এই হামলার মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে গত চার বছর ধরে টিকে থাকা দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্পূর্ণ অবসান ঘটল। বৈশ্বিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক তরবজর্ন সলভড এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যকার এই সংঘাত অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক একটি সময়ে সামনে এসেছে। এই লড়াই যদি আরও তীব্র রূপ ধারণ করে এবং তা লোহিত সাগরের তেল রপ্তানি অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের রুটে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা এই অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানির একমাত্র প্রধান বিকল্প পথটিকেও পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও হুথিদের পক্ষ থেকে আসা এই সর্বশেষ হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে সৌদি সরকার। লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইয়েমেনি এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি যে এখন সরাসরি তেহরানের দিকনির্দেশনায় কাজ করছে, তা নিয়ে রিয়াদের কোনো সন্দেহ নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলার মধ্য দিয়েই মূলত এই সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল। এর তাৎক্ষণিক জবাবে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা যুদ্ধ শুরুর আগে পর্যন্ত বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
গত জুন মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই উত্তেজনা এখন এক বিস্ফোরক রূপ ধারণ করেছে, যা পুরো বিশ্বকে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করছে।