মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের কথা বিশ্ববাসীর সামনে পুনরায় ব্যক্ত করে এক নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই সংকট নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক কার্যালয় ওভাল অফিসে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক চলাকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই কড়া মন্তব্য প্রদান করেন।
গত ২১ জুলাই, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কৌশলগত দিকনির্দেশনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। সেখানেই ট্রাম্প ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে খোলামেলা ও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দীর্ঘ বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে বা নিদেনপক্ষে একটি সাক্ষাৎ করার জন্য চরমভাবে ব্যাকুল হয়ে আছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন মনে করে, ইরান এখনও এমন কোনো গঠনমূলক, যৌক্তিক বা অর্থবহ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার টেবিলে আসেনি যা একটি ফলপ্রসূ সংলাপের মজবুত ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সবসময়ই মধ্যপ্রাচ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালো ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে উল্লেখ করেন যে, ইরানকে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না।
এই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এমন কিছু ধারাবাহিক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার ফলে ইরানের সামরিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামো অভাবনীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, মার্কিন বাহিনীর চলমান অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক চাপের কারণে ইরান এমন এক করুণ ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, যা বিশ্ববাসী আগে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সতর্ক করে দেন যে, যদি এই মুহূর্তে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের অভিযান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে সেখান থেকে চলেও যায়, তবুও ইরানের বর্তমান ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যেতে দেশটিকে অন্তত কুড়ি থেকে পঁচিশ বছর সময় ব্যয় করতে হবে।
এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, দুই দেশের মধ্যকার এই অঘোষিত ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এখনও শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার চলমান সামরিক অভিযানের বিশাল ব্যাপ্তি ও তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছিল, ইরানের ক্ষেত্রে তার মাত্রা, পরিধি এবং ধ্বংসক্ষমতা অনেক গুণ বড় এবং ভয়াবহ। তিনি চরম কঠোর ভাষায় তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, ইরান এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসল সামরিক সক্ষমতা ও ধ্বংসলীলার কিছুই দেখেনি।
এতদিন ধরে ওয়াশিংটন অত্যন্ত নমনীয়, কৌশলগত এবং ধৈর্যশীল আচরণ করে আসছিল, কিন্তু এখন সেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে বর্তমানে এই মর্মে জোরালো গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইরান সম্ভাব্য মার্কিন হামলা থেকে রক্ষা পেতে তাদের স্পর্শকাতর পারমাণবিক সেন্ট্রিফিউজগুলো পিকঅ্যাক্স পর্বতের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরিয়ে নিচ্ছে।
এই আলোড়িত প্রসঙ্গের জবাবে ট্রাম্প জানান যে, মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে বা আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল উপাদানগুলো যেখানেই লুকিয়ে রাখা হোক না কেন, খুব শিগগিরই সেখানে অত্যন্ত ভারী, ধ্বংসাত্মক ও মারাত্মক সামরিক হামলা চালানো হবে।
উদ্ভুত পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ ও গোপন সামরিক পর্যালোচনা বৈঠকে একাধিক কৌশলগত বিকল্প নিয়ে গভীর আলোচনা করা হচ্ছে।
এই বিকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি হলো ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত খার্গ দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া। এর মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
একইসঙ্গে, পিকঅ্যাক্স পর্বতের গভীর তলদেশে অবস্থিত বলে ধারণা করা পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি এবং নির্ভুল বিমান হামলা চালানোর বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মহান লক্ষ্যে সম্প্রতি আয়োজিত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়। তবে সেই চুক্তির শর্তগুলোও বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
গত সপ্তাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তাদের সামরিক আক্রমণের মাত্রা আরও জোরদার করেছে। এর জবাবে ইরানও নীরব দর্শক হয়ে বসে নেই; তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত পাল্টা আঘাত হানছে।
এই পাল্টাপাল্টি প্রাণঘাতী আঘাতের ফলে পুরো অঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া এই কঠোর ও সময়োপযোগী সামরিক পদক্ষেপগুলোর কারণেই মূলত ইসরায়েলের অস্তিত্ব এখনও টিকে রয়েছে।
তিনি তার বক্তব্যের শেষে এই কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের আক্রমণ কোনোভাবেই থামাবে না, বরং খুব দ্রুতই নতুন নতুন কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আরও ভয়াবহ আঘাত হানা হবে।