আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি বিস্তারিত ও গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা বিশ্বনেতাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের শরৎকালেই এই বিশাল স্থানান্তরের কাজ অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে তেহরান সরকার।
সেন্ট্রিফিউজগুলো নাতাঞ্জ শহরের কাছাকাছি অবস্থিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ বা পিকঅ্যাক্স পর্বত নামে পরিচিত একটি দুর্ভেদ্য সামরিক স্থাপনায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এক গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পিকঅ্যাক্স পর্বতের এই বিশেষ স্থাপনাটির নির্মাণশৈলী, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় ও বিস্ময়কর। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শক্ত গ্রানাইট শিলার স্তর ভেদ করে মাটির প্রায় তিনশো ফুটেরও বেশি গভীরে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে আধুনিক যুগের যেকোনো ধরনের শক্তিশালী বিমান বা বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে এটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় যে ভয়াবহ ও সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছিল, সেই সময়ও এই অত্যাধুনিক ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল।
সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সেই আগের হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও মূল্যবান পারমাণবিক সরঞ্জামগুলো এই অভেদ্য দুর্গে স্থানান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত পনেরো মাস ধরে মহাকাশ থেকে ধারণ করা বিভিন্ন স্যাটেলাইট চিত্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্যে সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে যে, ওই পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক মাত্রায় নির্মাণকাজ পরিচালিত হয়েছে এবং প্রচুর পরিমাণে ভারী ট্রাকের সন্দেহজনক ও নিরবচ্ছিন্ন চলাচল ছিল।
তবে, এই বিপুল সংখ্যক সেন্ট্রিফিউজ ঠিক কোন জায়গা থেকে সেখানে আনা হয়েছে, সে বিষয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দারা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
ইরানের এই কৌশলগত নতুন পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক তদারকি সংস্থাগুলোর দুশ্চিন্তা ক্রমশ বাড়ছে। জাতিসংঘের অধীনস্থ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এখনও পর্যন্ত এই নতুন ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি পরিদর্শনের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি পায়নি।
ইরানের এই অসহযোগিতামূলক আচরণের ফলে সেখানে ঠিক কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কতটুকু, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সম্পূর্ণ অজানা রয়ে গেছে।
আইএইএ-এর বর্তমান মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এই জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানান যে, তেহরান প্রশাসন ২০২১ সালেই তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিল যে তারা ওই নির্দিষ্ট স্থানে পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করার পরিকল্পনা করছে।
কিন্তু বর্তমানে সেখানে পরিদর্শনের কোনো সুযোগ না থাকায় সেই পরিকল্পনার বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তির স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই পুরো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তিনি পিকঅ্যাক্স পর্বতের এই গোপন পারমাণবিক স্থাপনাটিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে খুব শিগগিরই সেখানে একটি বড় ধরনের ও ধ্বংসাত্মক হামলার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তার এই আগ্রাসী বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নাজুক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঘোলাটে ও বিপজ্জনক করে তুলেছে। অন্যদিকে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সাবেক এক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের সম্পূর্ণ নজরদারির বাইরে গিয়ে যদি কোনো দেশে পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে তা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, এই ধরনের সামরিক গোপনীয়তা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। এতসব গুরুতর অভিযোগ, স্যাটেলাইট চিত্রের অকাট্য প্রমাণ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকির মুখেও ইরান সরকার তাদের পুরনো অবস্থানে আগের মতোই অনড় রয়েছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে বরাবরই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করা হয়ে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মতো ধ্বংসাত্মক কোনো উদ্দেশ্য পোষণ করে না, বরং দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ অন্যান্য বেসামরিক ও গবেষণামূলক কাজেই এই পারমাণবিক প্রযুক্তি ও শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েল ইরানের এই প্রচলিত দাবি মেনে নিতে একেবারেই নারাজ।