বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দিলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ০১:২৪ পিএম

সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দিলেন ট্রাম্প
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পারমাণবিক চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক বিস্তারিত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।

 

এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ও সুদূরপ্রসারী মাত্রার সূচনা হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষকরা। অনুমোদিত চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, সৌদি আরব এখন থেকে নিজেদের দেশে সম্পূর্ণ বেসামরিক খাতে পরমাণু শক্তির স্বাধীন ও নির্বিঘ্ন ব্যবহার করার অধিকার লাভ করবে।

 

এর বিনিময়ে আগামী তিন দশক বা ত্রিশ বছর পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন সম্পর্কিত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা উপকরণ এবং সার্বিক কৌশলগত পরামর্শ সহায়তা প্রদান করবে।

 

এই বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মযজ্ঞের আর্থিক মূল্যমান হিসেবে সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক হাজার কোটি ডলার প্রদান করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সংশ্লিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক চুক্তির আনুষ্ঠানিক খসড়া যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট বা কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য উত্থাপন করা হবে।

 

মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ-হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেটে এই বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হলেই তা চূড়ান্তভাবে কার্যকর বলে গণ্য হবে। জানা গেছে, কংগ্রেসে উত্থাপিত চুক্তির খসড়ার সঙ্গে ‘১২৩ অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ১২৩ চুক্তি নামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও কাঠামোগত নথিও পাঠানো হবে।

 

মূলত এই বিশেষ নথিটি বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পারমাণবিক সহযোগিতার আইনি রূপরেখা ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে থাকে। এই চুক্তিটি যদি কংগ্রেসে সফলভাবে পার হয়ে কার্যকর হয়, তবে খুব স্বাভাবিকভাবেই সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক শক্তি খাত এবং বিশাল বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সরাসরি বিনিয়োগের এক অভাবনীয় দুয়ার মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।

 

এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বেশি সুদৃঢ় কাঠামোর ওপর দাঁড়াবে। তবে এই চুক্তির বেশ কিছু কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক সংশয় ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক অনুমোদিত এই চুক্তিতে পারমাণবিক সুরক্ষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা স্বর্ণমান নীতি ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর সহজ অর্থ হলো, সৌদি আরব যদি তাদের জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন মনে করে, তবে তারা এই চুক্তির আওতায় থেকেই স্বাধীনভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম নিজেদের দেশেই অবাধে চালিয়ে যেতে পারবে।

 

এর পাশাপাশি, চুক্তিতে ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ বা অ্যাডিশনাল প্রটোকল নীতিও সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিয়মানুযায়ী, অতিরিক্ত প্রটোকল হলো এমন একটি কঠোর নজরদারি নীতি, যার মাধ্যমে জাতিসংঘের পারমাণবিক প্রকল্প পর্যবেক্ষণ বিষয়ক প্রধান অঙ্গসংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) যেকোনো সময় পূর্বঘোষণা ছাড়াই সন্দেহভাজন যেকোনো দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির স্থাপনা সরাসরি পরিদর্শন করার ক্ষমতা রাখে।

 

বিশ্বের যেকোনো দেশের বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিতে এই অতিরিক্ত প্রটোকলের অন্তর্ভুক্তি কার্যত অপরিহার্য হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদিত চুক্তির খসড়ায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই পারমাণবিক প্রকল্পের সমস্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারির মাপকাঠি কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে, তৃতীয় কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার এখানে সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না।

 

এই নজিরবিহীন ও শিথিল শর্তগুলোর কারণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মার্কিন কংগ্রেসে যদি এই চুক্তির খসড়া বিনা বাধায় পাস হয়ে যায়, তবে স্বাধীনভাবে ইউরেনিয়াম ক্রয় এবং তা নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করার পথে সৌদি আরবের সামনে আর কোনো আন্তর্জাতিক বা আইনগত বাধা থাকবে না।

 

বিশেষজ্ঞরা আগেই কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নজরদারি বা কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা আরোপ করা না হলে এই ধরনের শিথিল চুক্তি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির এক বিপজ্জনক পথ খুলে দিতে পারে।

 

এই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পূর্ববর্তী কিছু দ্ব্যর্থহীন মন্তব্যের কারণে। তিনি এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে একাধিকবার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, তাদের আঞ্চলিক চির প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র ইরান যদি কোনোভাবে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে সক্ষম হয়, তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে সৌদি আরবও নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের পথে হাঁটতে একটুও পিছপা হবে না।

 

বৈজ্ঞানিক ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরির দু’টি প্রধান ও চূড়ান্ত ধাপ হলো উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ। বর্তমানে বিশ্বের যেসব দেশ শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক চুল্লি পরিচালনা করে, তাদের বেশিরভাগই অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম উৎপাদনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে না গিয়ে কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে বিদেশ থেকে পূর্ব-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানি করে থাকে।

 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও আইএইএ অনুমোদিত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশকে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একচ্ছত্র অনুমতি দেওয়া হলে তা বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের মারাত্মক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। বর্তমান চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পারমাণবিক প্রতিযোগিতার এক নতুন ও ভয়াবহ অধ্যায় শুরু হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা প্রবল আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।

 

- রয়টার্স, ইন্ডিয়া টুডে