বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় মধ্যস্থতা

ওয়াশিংটনের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল চাইল পাকিস্তান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

ওয়াশিংটনের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিল চাইল পাকিস্তান
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতে সফল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের পরপরই ওয়াশিংটনের কাছে বিশাল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা চেয়েছে ইসলামাবাদ।

 

চরম অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ 'বিনিময় স্থিতিশীলতা সহায়তা তহবিল' বা এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

 

বুধবার, ২২ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই বিপুল অঙ্কের তহবিলের অনুমোদন দেওয়া হয়, তবে তা বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটে থাকা পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে এই প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসা পাকিস্তানের এই বিশাল আর্থিক অনুরোধটি এমন এক সময়ে করা হলো, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে পাকিস্তানের সক্রিয় ও প্রশংসনীয় মধ্যস্থতা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

 

বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বে সফল কূটনৈতিক তৎপরতা প্রদর্শনের মাধ্যমে পাকিস্তান কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবমূর্তিই উজ্জ্বল করেনি, বরং ওয়াশিংটনসহ পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছ থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনাকেও বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি বা অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের কাছে পাঠানো এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিঠিতে ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছর মেয়াদি এই ১০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক স্থিতিশীলতা সহায়তা তহবিল গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

 

বর্তমানে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অত্যন্ত কঠোর ও কঠিন শর্তসাপেক্ষ একটি বৃহৎ ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো নানাবিধ অপ্রিয় কাঠামোগত সংস্কার করতে বাধ্য হচ্ছে দেশটির সরকার।

 

ঠিক এমন এক দমবন্ধ করা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রস্তাবিত এই নতুন তহবিল পাওয়া গেলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

 

একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানি রুপির ক্রমাগত দরপতন ও অবমূল্যায়নের ওপর যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা অনেকাংশেই প্রশমিত হবে। সর্বোপরি, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মতো বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর ওপর থেকে পাকিস্তানের একচ্ছত্র নির্ভরতাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

 

প্রস্তাবিত এই বিশাল তহবিলের বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পাশাপাশি, পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ও রয়টার্সের প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলোর তাৎক্ষণিক কোনো সদুত্তর দেয়নি।

 

তবে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সাধারণ সংবাদ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারির সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের বর্তমান অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব।

 

ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে বহুমুখী ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। যদিও সরকারি ওই বিবৃতিতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিলের অনুরোধের বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

 

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে পাকিস্তানের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, তলানিতে ঠেকে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান উন্নয়নের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সহায়তা চেয়েছেন পাকিস্তানি অর্থমন্ত্রী।

 

উভয় পক্ষই তাদের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও গভীর করা, পাকিস্তানে মার্কিন বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো যৌথভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নিজেদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

 

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্সচেঞ্জ স্ট্যাবিলাইজেশন ফ্যাসিলিটি’ হলো মার্কিন ট্রেজারির একটি অত্যন্ত বিরল ও বিশেষায়িত সহায়তা ব্যবস্থা, যা সাধারণত সরাসরি ডলার প্রদান, মুদ্রা বিনিময় বা গ্যারান্টির মাধ্যমে কোনো মিত্র দেশের রিজার্ভ রক্ষা ও নিজস্ব মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

 

মেক্সিকোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সোয়াপ লাইন চুক্তির বাইরে ২০০২ সালে উরুগুয়ে এবং সাম্প্রতিককালে লাতিন আমেরিকার আরেক দেশ আর্জেন্টিনা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এ ধরনের বিশেষ সহায়তা লাভ করেছিল।

 

পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। গত ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি সাময়িক চুক্তির মাধ্যমে দেশটি একেবারে শেষ মুহূর্তে নিজেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঋণখেলাপি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

 

পরবর্তীতে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থসহ মোট ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় ঋণ প্যাকেজের অনুমোদন পায় ইসলামাবাদ। তা সত্ত্বেও, বর্তমানে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মূলত দীর্ঘদিনের মিত্র চীন এবং সৌদি আরবের গচ্ছিত আমানত ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক সহায়তার ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল।

 

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে পাকিস্তানকে, যা দেশটির তৎকালীন রিজার্ভের একটি বিশাল অংশ ছিল। তবে পরবর্তীতে বন্ধুরাষ্ট্র সৌদি আরব নতুন করে ৩ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্রদান করায় পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।

 

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান গত জানুয়ারিতে এক পূর্বাভাসে জানিয়েছিল যে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় কূটনৈতিক মধ্যস্থতার পুরস্কার হিসেবে ওয়াশিংটন সত্যিই পাকিস্তানকে এই বিশাল আর্থিক সহায়তা প্রদান করে কি না।

 

- রয়টার্স