মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্য ছাপিয়ে নতুন অঞ্চলে প্রসারিত হচ্ছে ইরান সংঘাত!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য ছাপিয়ে নতুন অঞ্চলে প্রসারিত হচ্ছে ইরান সংঘাত!
ছবি : Collected

দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী উত্তেজনা ও টানা ১৩ রাতের তাণ্ডব শেষে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হামলা আপাতত স্থবির থাকলেও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত থামেনি, বরং তা নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

 

একদিকে লোহিত সাগরের কৌশলগত জলসীমায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের আকস্মিক আক্রমণ-সব মিলিয়ে আঞ্চলিক ও বিশ্ব নিরাপত্তায় এক অভূতপূর্ব জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

পরাশক্তিগুলোর সামরিক কৌশল ও আঞ্চলিক মিত্রদের টানাপোড়েনে এই সংকট এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। সংঘাতের সার্বিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, টানা দুই সপ্তাহের তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন করে কোনো হামলা পরিচালনা করেনি।

 

যদিও ওয়াশিংটন জানিয়েছে যে ইরানের উপকূলে তাদের নৌ অবরোধ পুরোপুরি বহাল রয়েছে, তবে কেন এই সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হলো, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর থেকে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

 

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন।

 

সেখানে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ ও উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর তীব্র উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেন। এর পরেই হোয়াইট হাউস কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার স্বার্থে এবং অস্ত্রের শক্তি ধরে রাখতে সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপ স্থগিতের ইতিবাচক সাড়া হিসেবে তেহরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে তাদের দৈনন্দিন পাল্টা হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে।

 

মার্কিন বাহিনী ও ইরানের মধ্যে সরাসরি গোলাগুলি কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাতের নতুন দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছে। সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, তারা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিজান শোধনাগার এবং ইয়ানবুর তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স দ্বারা যাচাইকৃত ফুটেজে জিজানের তেল শোধনাগার এলাকা থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। এছাড়া ইয়ানবুর আকাশে নিক্ষিপ্ত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়।

 

এই হামলার বিষয়ে আরামকো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য না দিলেও আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও এখন নৌ চলাচলের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

 

এই উদ্ভূত পরিস্থিতির জেরে ইয়েমেনের প্রথাগত অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধও নতুন করে মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে। দেশটির মারিব ও আল-জাওফ অঞ্চলে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে নতুন করে জোরদার বিমান হামলা চালিয়েছে।

 

একই সাথে উভয় পক্ষই নিজ নিজ সীমান্তে বিপুল পরিমাণ নতুন সৈন্য মোতায়েন করতে শুরু করায় দেশটি আবারও একটি পূর্ণমাত্রার ধ্বংসাত্মক সংঘাতের মুখোমুখি হচ্ছে। অন্যদিকে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক মোড় দেখা গেছে কাস্পিয়ান সাগরে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জলসীমায় ইরান অভিযোগ তুলেছে যে, কাস্পিয়ান সাগরে চলাচলকারী তাদের একটি বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণে জাহাজে থাকা এক ইরানি নাবিক নিহত হয়েছেন এবং আরও একজন মারাত্মকভাবে আহত হন। এই নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে দ্রুত তলব করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

ঘটনাটির পরোক্ষ সত্যতা স্বীকার করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি উল্টো দাবি করেছেন যে, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নিজেদের সংগৃহীত সংবেদনশীল স্যাটেলাইট তথ্য নিয়মিত ইরানকে সরবরাহ করছে, যা তেহরানের সামরিক সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করছে। ইউরোপের ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের এই সরাসরি আন্তঃসংযোগ গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে নতুন করে এক মহা অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

- নিউজ২৪