সোমবার, ২৭ জুলাই ভোরে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের জাতীয় সংসদ মজলিসের প্রভাবশালী জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এই কড়া হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে আঞ্চলিক সংঘাতের এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় হিসেবে আখ্যায়িত করছে, যা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে নিবিড়ভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নীতিগত পোস্টে ইব্রাহিম আজিজি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিরুদ্ধে পরিচালিত কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপকেই তেহরান কখনো বিনা জবাবে ছেড়ে দেয় না এবং ভবিষ্যতেও দেবে না।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে লিখেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলারই একটি সুনির্দিষ্ট ও চরম মূল্য রয়েছে এবং আজও আন্তর্জাতিক সামরিক ময়দানে সেই অমোঘ বাস্তবতা সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রয়েছে।
তার এই সতর্কবার্তার পরিধি কেবল ইউক্রেনের নীতিনির্ধারকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের দিকেও সরাসরি ইঙ্গিত করে বলেছেন যে, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব এই নির্মম সত্যটি খুব ভালোভাবে অবগত রয়েছে।
আজিজি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইউক্রেন সরকারও হয়তো খুব শিগগিরই এই কঠোর বাস্তবতা অনুধাবন করতে সক্ষম হবে যে, ইরান নিজের অস্তিত্ব বা জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে নেওয়া কোনো হটকারী পদক্ষেপের জবাব না দিয়ে কখনো নীরব থাকে না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যারা ইরানের সক্ষমতা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভুল হিসাবনিকাশ করে চলেছে, তাদের সেই ব্যর্থ তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এই নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে মূলত গত শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি দাবির মধ্য দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন যে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী কাস্পিয়ান সাগরে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট জাহাজের ওপর সফল হামলা পরিচালনা করেছে, যেগুলো তার দাবি অনুযায়ী ইরানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট এবং সেগুলো ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জাম বা মালামাল পরিবহন করা হচ্ছিল।
তিনি আরও দাবি করেছিলেন যে, একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজও তাদের এই অভাবনীয় সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। ইউক্রেনের এই সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের দাবির পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত ঘোলাটে হতে শুরু করে এবং ইরান এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার তীব্র ও আনুষ্ঠানিক নিন্দা জ্ঞাপন করে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে।
তেহরানের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে জানানো হয়, ইউক্রেনের বাহিনী মূলত একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। ইরানের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, এই আকস্মিক ও প্রাণঘাতী হামলায় তাদের একজন নিরীহ নাবিক মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন এবং অপর একজন নাবিক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।
এছাড়া তাদের ওই বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজটিও এই হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইউক্রেনের এই একতরফা পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।
তিনি ভলোদিমির জেলেনস্কির নির্দেশনায় পরিচালিত এই বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং নিরীহ নাবিক হত্যার ঘটনাকে বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি ‘জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জোরালোভাবে দাবি করেন যে, ইউক্রেনের এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ মূলত সম্পূর্ণ ইউরোপ মহাদেশকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে টেনে আনার লক্ষ্যে ইসরায়েলের সুপরিকল্পিত প্ররোচনাতেই সংঘটিত হয়েছে।
এই গভীর সংকটের কূটনৈতিক মাত্রা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যখন আরাকচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাস এবং রাশিয়ার বর্ষীয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ-এর সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে পৃথক টেলিফোন আলাপে যুক্ত হন।
এই গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপগুলোতে তিনি স্পষ্টভাবে পশ্চিমা ও রুশ নেতৃত্বকে এই বার্তা দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইউক্রেনের এহেন বেপরোয়া ও বেআইনি পদক্ষেপের কোনোভাবেই জবাবহীন থাকা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাস্পিয়ান সাগরের মতো একটি কৌশলগত ও স্পর্শকাতর অঞ্চলে সংঘাতের এই বিস্তার কেবল ইরান ও ইউক্রেনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চরম অবনতিই ঘটাবে না, বরং এটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বহুমুখী সংকটকে এক সূত্রে গেঁথে বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক নতুন ও ভয়াবহ হুমকি তৈরি করতে পারে।