গত রোববার, ২৬ জুলাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই দৃঢ় অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, তাঁর এই ঘোষণা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং বহুল প্রতীক্ষিত আঞ্চলিক শান্তির সম্ভাবনাকে নতুন এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া ওই বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ভবিষ্যৎ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে তেহরানের প্রধান ও অমোঘ শর্তই হলো লেবাননে ইসরায়েলি বর্বরোচিত হামলার চিরতরে অবসান।
স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং প্রতিরোধকামী সংগঠন হিজবুল্লাহর লড়াকু যোদ্ধাদের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন জুগিয়ে যাওয়াকে ইরান নিজেদের একটি পবিত্র ও কৌশলগত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বলে গভীরভাবে বিশ্বাস করে।
তিনি তাঁর বার্তায় অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উচ্চারণ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যেকোনো চুক্তির রূপরেখা তৈরি করা হোক না কেন, সেখানে লেবানন ইস্যুকে অবশ্যই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
লেবাননের নিরীহ নাগরিকদের জীবন ও তাদের মাতৃভূমির সুরক্ষাকে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের আপসরফা তেহরানের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছেন।
কূটনৈতিক মহলের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই বরফ গলার একটি ক্ষীণ সম্ভাবনা সম্প্রতি তৈরি হয়েছিল। গত জুন মাসে উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি প্রাথমিক সমঝোতার পথও তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিলে সেই শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত চরমভাবে ভেস্তে যায়।
সেই স্থবির কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার রেশ কাটতে না কাটতেই লেবানন সংকট এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের পথে নতুন এবং সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সীমান্ত সংঘাত এক ভয়াবহ মানবিক ও সামরিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লেবাননের প্রভাবশালী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ সেই প্রস্তাবিত চুক্তিকে সম্পূর্ণ একপেশে, অন্যায্য এবং কেবল ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষার দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করে তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
হিজবুল্লাহর দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননের সার্বভৌমত্বকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, যা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। যুদ্ধের ময়দানের বাস্তব চিত্রও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও পূর্বনির্ধারিত প্রতিশ্রুতি চরমভাবে লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নির্ধারিত এলাকাগুলো থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করেনি।
উল্টো তারা ওই অঞ্চলে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর, বেসামরিক স্থাপনা ও কৃষিজমির ওপর নির্বিচারে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। দখলদার বাহিনীর এই অমানবিক আগ্রাসনের ফলে সেখানে প্রতিনিয়ত অসংখ্য নিরীহ মানুষ নিজেদের জীবন ও সহায়সম্বল হারাচ্ছেন।
এই দীর্ঘস্থায়ী ও অসম সংঘাত লেবাননের মাটিতে এক অবর্ণনীয় ও মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্র ও আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান এই সংঘাতে লেবাননে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩২৯ জনেরও বেশি মানুষ অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই হলো নিরীহ নারী ও শিশু।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সংঘাত থামার কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সর্বশেষ এই কঠোর অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, লেবাননে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শান্তি পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখবে না।