ঘরোয়া রাজনীতিতে তার মূল দাবিই ছিল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন গভীর, কৌশলগত ও নিবিড় বোঝাপড়া অক্ষুণ্ণ রেখে ইসরায়েলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা কেবল তারই রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তিত মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তার সেই বহু আলোচিত ও শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানটি আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া রাজনীতিতে ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
কৈশোর ও প্রাথমিক জীবনের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে কাটানোর ফলে আমেরিকান ধারার ইংরেজিতে নিখুঁতভাবে কথা বলা এবং মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূক্ষ্ম বিষয়গুলো অনুধাবন করা নেতানিয়াহুর জন্য সর্বদাই সহজ ছিল।
বিগত কয়েক দশকে একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন জয় করে ইসরায়েলের পক্ষে অসামান্য অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে তার ঝুলিতে বহু সফলতা রয়েছে। আগামী অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দেশের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবং অভ্যন্তরীণ আদালতের গুরুতর দুর্নীতির মামলার বিচার সামলাতে তিনি আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে নিজ দেশে খর্ব হওয়া জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একসময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ও সুদৃঢ় সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের উদ্যোগে ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ সায় সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পেয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতায় রূপ নেওয়ায় এবং ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়েই তেহরানের সঙ্গে নতুন কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোঁজায় সেই সমীকরণ দ্রুত বদলে গেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী মহলে এখন এমন শক্তিশালী ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, নেতানিয়াহু মূলত মার্কিন প্রশাসনকে একটি অপ্রয়োজনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত বিপর্যয়ে পর্যবসিত হয়েছে।
ফলে নেতানিয়াহুকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিচক্ষণ নেতা হিসেবে তুলে ধরার সময় এখন কার্যত শেষ হয়ে এসেছে। চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার কথা বলে ওয়াশিংটন সফর করলেও, সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাসের মতে, এই সফরের পেছনে গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বিদ্যমান।
একদিকে নিজের দল ও সমর্থকদের কাছে বার্তা দেওয়া যে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এখনো সুদৃঢ় রয়েছে; অন্যদিকে ইসরায়েলে তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলায় ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পরোক্ষ সহানুভূতি বা সমর্থনের পরিবেশ তৈরি করা।
কিন্তু তেহরানে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তন না হওয়া, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রতি সরকারের নমনীয় অবস্থান এবং একজন মার্কিন নাগরিককে বেআইনিভাবে আটকের ঘটনা মার্কিন কংগ্রেসে নেতানিয়াহু-বিরোধী ক্ষোভ বৃদ্ধি করেছে।
এর বাইরেও তুরস্কের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির পরিকল্পনা এবং সৌদি আরবের সাথে ওয়াশিংটনের পারমাণবিক সহযোগিতার আলোচনা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি করেছে। এমনকি আমেরিকার উদীয়মান কট্টর ডানপন্থী বলয় ও রিপাবলিকান পার্টির নীতি নির্ধারকদের মধ্যেও এখন নেতানিয়াহুর প্রতি চরম অসন্তোষ লক্ষ করা যাচ্ছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং শীর্ষস্থানীয় পডকাস্টাররা প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইসরায়েল সরকার নিজ দেশের রাজনৈতিক স্বার্থে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
ফলে প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বজায় থাকলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব 'আমেরিকা ফার্স্ট' বা স্বার্থকেন্দ্রিক নীতির কাছে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রভাব এখন চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র সমর্থক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার পথটি নেতানিয়াহুর জন্য আর আগের মতো সহজ থাকছে না।