শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পরপরই জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পরপরই জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক অভূতপূর্ব ও চরম উত্তেজনাকর মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এবার জর্ডানের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে পাল্টা ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া এক অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারির পরপরই তেহরানের এই আগ্রাসী পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর ও সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

জর্ডানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘পেট্রা’ তাদের দেশের সশস্ত্র বাহিনীর একজন শীর্ষ মুখপাত্রের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছে। সংবাদমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা অত্যন্ত শক্তিশালী পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করলে দেশের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো শনাক্ত করে এবং সফলভাবে আকাশেই ধ্বংস করে দেয়।

 

তবে এই অতর্কিত ও ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রাণহানি বা বড় কোনো অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও, একটি সার্বভৌম আরব রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং জর্ডানের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

 

জর্ডানে ইরানের এই বেপরোয়া হামলার ঠিক আগেই, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের অভ্যন্তরে এক নজিরবিহীন ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।

 

সেন্টকমের পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুদ্ধবিমান ও অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইরানের অত্যন্ত ক্ষমতাধর সামরিক শাখা ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর’ (আইআরজিসি) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থাপনায় তীব্র মাত্রায় বোমাবর্ষণ করেছে।

 

মার্কিন এই সুপরিকল্পিত হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল আইআরজিসির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড সেন্টার, অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত করার বিশাল ও গোপন ঘাঁটি এবং উপকূলীয় এলাকার অত্যন্ত সংবেদনশীল নজরদারি ও সামরিক প্রতিরক্ষা অবকাঠামোগুলো।

 

উল্লেখ্য, সম্প্রতি জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রাণঘাতী হামলার পর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।

 

তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন যে, মার্কিন সেনাদের ওপর যেকোনো হামলার জবাবে ওয়াশিংটন অত্যন্ত নির্মম ও কঠোরভাবে প্রত্যাঘাত করবে। ট্রাম্পের সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয়।

 

অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরে মার্কিন হামলার প্রত্যক্ষ প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো প্রাথমিক কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলায় অন্তত দুজন সাধারণ নাগরিক আহত হয়েছেন।

 

এর পাশাপাশি, দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন স্থানেও একাধিক শক্তিশালী ও রহস্যময় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। মূলত, পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে গত কয়েকদিন ধরেই এক থমথমে পরিস্থিতি ও যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল।

 

এর আগে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকে অবস্থানরত ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী যৌথভাবে আকস্মিক ও বড় ধরনের হামলা চালালে এই আঞ্চলিক উত্তেজনার পারদ নতুন করে চরম আকার ধারণ করে।

 

সেই ঘটনারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান এই বহুমুখী ও জটিল সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে বলে সমরবিদরা ধারণা করছেন। সামরিক এই উত্তেজনা কেবল ইরান, ইরাক বা জর্ডানের ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক নৌপথ ও সমুদ্রসীমাতেও।

 

যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘অ্যামব্রে’ একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, মিসরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দামিয়েত্তা বন্দরে অবস্থানরত দুটি বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজে অজ্ঞাত চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন দিয়ে আকস্মিক হামলা চালানো হয়েছে।

 

এই রহস্যজনক হামলার ফলে জাহাজ দুটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যা সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটির মধ্যে একটি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ভাসমান গ্যাস সংরক্ষণাগার এবং অপরটি ইউরোপের দেশ গ্রিসের মালিকানাধীন একটি সুবিশাল বাণিজ্যিক ট্যাংকার।

 

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো নাবিক বা কর্মীর হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি এবং কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা সংগঠন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এই সামুদ্রিক হামলার দায়ভার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।

 

সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই ধারাবাহিক ও প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতাকে এক নতুন ও ভয়ংকর মাত্রায় নিয়ে গেছে।

 

একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অনমনীয় সামরিক নীতি এবং অন্যদিকে তেহরানের পাল্টা ও আগ্রাসী প্রতিরোধ-সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

 

- আল আরাবিয়া