শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মার্কিন বিমান হামলার কড়া জবাব

আগ্রাসীদের আজই শাস্তি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিল ইরান!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

আগ্রাসীদের আজই শাস্তি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিল ইরান!
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই এবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর চালানো নজিরবিহীন বিমান হামলার কড়া জবাব দেওয়ার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান।

 

ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সহায়তায় এই আগ্রাসী শক্তিকে আজই তাদের কৃতকর্মের জন্য চরম শাস্তি দেওয়া হবে।

 

আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমনিতেই এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার ওপর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই প্রত্যক্ষ ও পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় ও প্রভাবশালী বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাত দিয়ে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।

 

সামরিক বাহিনীর এই চরম হুঁশিয়ারিমূলক বার্তাটি ঠিক এমন এক সংকটময় সময়ে প্রকাশ্যে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, তারা রাতভর ইরানের অভ্যন্তরে থাকা সামরিক ও কৌশলগত বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।

 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম তাদের এক বিস্তারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, বুধবার স্থানীয় সময় রাত আটটা থেকে শুরু করে ইরানের নানাবিধ স্পর্শকাতর লক্ষ্যবস্তুতে এই সামরিক অভিযান শুরু করা হয়।

 

এই হামলার মূল কারণ হিসেবে সেন্টকম উল্লেখ করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও সামরিক মিত্রদের ওপর আগের দিন ইরান যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল, মূলত তার এক কঠোর ও সমুচিত জবাব দিতেই এই বড় মাপের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আকস্মিক ও শক্তিশালী বিমান হামলার পরপরই ইরানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত কয়েকটি অঞ্চলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

 

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে কেশম, কিশ, বন্দর আব্বাস, আবাদান এবং বুশেহরের মতো এলাকাগুলো। এই অঞ্চলগুলো ইরানের সামষ্টিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামরিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

 

বিশেষ করে বন্দর আব্বাস ও বুশেহরের মতো এলাকাগুলোতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও পারমাণবিক কাঠামোর অবস্থান রয়েছে, যা এই হামলাকে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।

 

রাতের অন্ধকারে এমন ভয়াবহ হামলার ফলে ওই সব এলাকার সাধারণ নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক মাত্রায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে নিজ ভূখণ্ডে এমন প্রকাশ্য ও সরাসরি হামলার পরপরই আইআরজিসি তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই কালক্ষেপণ করবে না এবং আজই এই বর্বরোচিত হামলার উপযুক্ত ও ধ্বংসাত্মক জবাব নিশ্চিত করবে।

 

আগ্রাসীদের কোনোভাবেই বিনা শাস্তিতে পার পেতে দেওয়া হবে না বলে তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। যদিও এই পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা ঠিক কী ধরনের হবে, কোন মাত্রার সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে অথবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে এই আক্রমণ চালানো হবে, সে বিষয়ে আইআরজিসি সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখেছে এবং বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

 

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অস্পষ্টতা মূলত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির সুনিপুণ কৌশল, যা প্রতিপক্ষকে সার্বক্ষণিক ভীতির মধ্যে রাখে। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।

 

আন্তর্জাতিক সমরবিদ ও নীতি-নির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই ধারাবাহিক ও প্রত্যক্ষ সংঘাত কেবল এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

 

ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ইরানের মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর আঞ্চলিক যোগাযোগ ছিন্ন করা এবং তাদের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরা। তবে বারবার সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও সেই উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়নি।

 

উল্টো, ইরান এখন তাদের সামরিক সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রদর্শন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় যেকোনো একটি পক্ষের সামান্যতম ভুল হিসাব-নিকাশ বা হঠকারী সিদ্ধান্ত পুরো পশ্চিম এশিয়াকে এক গভীর খাদের কিনারায় ঠেলে দিতে পারে।

 

বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অপরিহার্য নৌপথের নিরাপত্তা এই মুহূর্তে চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সার্বিকভাবে, বুধবার রাতে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন দফার বিমান হামলা বিগত কয়েক মাস ধরে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে আরও বহুগুণ তীব্রতর করে তুলেছে। এই নতুন দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কূটনৈতিকভাবে এই সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা বারবার মুখ থুবড়ে পড়ায় এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও নিজেদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই বিধ্বংসী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে জোরালো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

 

- ফার্স নিউজ