উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ও যুদ্ধবিরতির রূপরেখাকে তারা ধারাবাহিকভাবে নস্যাৎ করে চলেছে বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং গাজা ইস্যু নিয়ে কথা বলার সময় তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা বা কার্যকর কোনো পরিকল্পনা নেই।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। তুরস্কের এই শীর্ষ কূটনীতিকের মতে, গাজায় শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে আলোচনার নামে যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, ইসরায়েল সেটিকে মূলত একটি প্রহসনে পরিণত করেছে।
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয় তুলে ধরে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছেন যে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক, টেকসই ও মানবিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে ইসরায়েল এই প্রক্রিয়াটিকে কেবল সময়ক্ষেপণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই কালক্ষেপণের আড়ালে তারা মূলত নিজেদের আগ্রাসী সামরিক কৌশল এবং সম্প্রসারণবাদী নীতিকে আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। শান্তি আলোচনার টেবিলে বসার যে আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েল সরকারের কাছে প্রত্যাশা করে, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই বললেই চলে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনাটি মূলত গাজায় জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং পরবর্তীতে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে হাকান ফিদানের গভীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইসরায়েল প্রকাশ্যে এসব উদ্যোগের কথা বললেও বা আলোচনায় অংশ নিলেও মাঠপর্যায়ে তাদের সামরিক অভিযান এবং নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ সমানতালে অব্যাহত রেখেছে।
এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তারা কোনোভাবেই যুদ্ধ বন্ধ করতে বা ফিলিস্তিনিদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে আগ্রহী নয়। ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিকদের ওপর চলমান এই অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি তুরস্ক বরাবরই আন্তর্জাতিক মঞ্চে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছে এবং এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলের এই অবিরাম আগ্রাসনের সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ প্রভাব নিয়েও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব যে সীমাহীন বিস্তারমুখী এবং আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছে, তা কেবল ফিলিস্তিন বা মধ্যপ্রাচ্যের সীমানাতেই আবদ্ধ থাকবে না।
এই অদূরদর্শী, একগুঁয়ে এবং ধ্বংসাত্মক নীতি অদূর ভবিষ্যতে একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দিতে পারে, যা পুরো বিশ্বের জন্য অশনিসংকেত। আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো এবং জাতিসংঘ যদি এখনই এই আগ্রাসন থামাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা এক চরম হুমকির সম্মুখীন হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। গাজায় খাদ্যাভাব, চিকিৎসাসংকট এবং বাসস্থানের অভাবে মানবিক সংকট যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঠিক তখন ইসরায়েলের এমন অনমনীয় ও আগ্রাসী মনোভাব পুরো অঞ্চলটিকে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তুরস্ক প্রথম থেকেই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
হাকান ফিদানের এই মন্তব্য মূলত সেই ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার মাধ্যমে তিনি বিশ্ববিবেকের কাছে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সময়োপযোগী বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই তীক্ষ্ণ সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মরণিকা। শান্তি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কেবল সামরিক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরতা এবং নির্বিচার আগ্রাসন কখনোই কোনো সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বয়ে আনতে পারে না।
ইসরায়েল যদি তাদের বর্তমান একগুঁয়ে অবস্থান থেকে সরে না আসে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিজেদের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের শান্তি প্রস্তাবকেও এভাবে অবজ্ঞা করতে থাকে, তবে পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
ফিলিস্তিন সংকটের একটি ন্যায়সংগত, মানবিক ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হলে ইসরায়েলকে অবশ্যই তাদের এই ধ্বংসাত্মক নীতি পরিহার করে প্রকৃত আন্তরিকতার সঙ্গে শান্তি আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায়, এই সংঘাতের দাবানল সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার যে আশঙ্কা তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন, তা বাস্তবে রূপ নিতে খুব বেশি সময় লাগবে না।