যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য সংস্থা ইউকেএমটিও এক বিস্তারিত বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দর থেকে আনুমানিক ৬৩ নটিক্যাল মাইল পশ্চিমে এই অতর্কিত হামলার শিকার হয় জাহাজটি।
এই আকস্মিক ও রহস্যজনক আঘাতের ফলে জাহাজটির মূল ডেকে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার বিশ্বস্ত সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির একজন দায়িত্বশীল নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, একটি ট্যাংকার জাহাজ লক্ষ্য করে এই অজ্ঞাত বস্তু নিক্ষেপ করা হয় এবং এর শক্তিশালী অভিঘাতে জাহাজটির মূল ডেকে তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে যে, কোম্পানির নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা ট্যাংকারটিতে অজ্ঞাত বস্তু আঘাত হানার এবং মূল ডেকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়েছেন।
এই হামলার পর পরই জাহাজে থাকা জরুরি নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন প্রোটোকল ও পূর্বনির্ধারিত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়, যার ফলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় এবং বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো যায়।
সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এই ভয়াবহ হামলার পরেও জাহাজে অবস্থানরত সব ক্রু ও কর্মী সম্পূর্ণ নিরাপদ, অক্ষত এবং বিপদমুক্ত আছেন। ইউকেএমটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, জাহাজে আগুন লাগার মতো বিপজ্জনক দুর্ঘটনা ঘটলেও পরিবেশের ওপর এর কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ক্রুদের অসাধারণ পেশাদারি এবং দ্রুত কার্যকর করা উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণেই বড় ধরনের কোনো মানবিক বা পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও নিরাপত্তা প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
বর্তমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ওই কৌশলগত সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইউকেএমটিও ওই অঞ্চলের আশপাশ দিয়ে যাতায়াতকারী সব নৌযানকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড, নৌযান বা অস্বাভাবিক গতিবিধি লক্ষ্য করার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর কড়া আহ্বান জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লোহিত সাগরে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে চলাচলকারী জাহাজগুলো বারবার তীব্র ও বহুমুখী নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
লোহিত সাগর বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী বা রুট হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বহু তেলবাহী ট্যাংকার ও বহুমুখী পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
ইয়ানবু বন্দরের কাছে ঘটিত এই সর্বশেষ হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন করে জটিলতার মাত্রা যোগ করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক জলসীমায় এ ধরনের গোপন বা অজ্ঞাত হামলা কেবল নির্দিষ্ট কোনো দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
এ ধরনের ধারাবাহিক হামলার ফলে ওই রুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোর বীমা খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা পুরোপুরি প্রতিরোধে আরও কঠোর ও কার্যকর যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছে। লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।