শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোজতবা খামেনির মৃত্যু নিয়ে সন্দিহান ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম

মোজতবা খামেনির মৃত্যু নিয়ে সন্দিহান ট্রাম্প
ছবি : Collected

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির মৃত্যুর গুঞ্জন নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা এবং তার বেঁচে থাকা নিয়ে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা চললেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করেন তিনি সম্ভবত এখনও জীবিত আছেন।

 

তবে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ বা স্বাভাবিক অবস্থায় আছেন, এমনটি মানতেও নারাজ ট্রাম্প। তার প্রবল ধারণা, ইরানের এই শীর্ষ ক্ষমতাধর নেতা কোনো কারণে গুরুতরভাবে আহত হয়ে থাকতে পারেন এবং সেই কারণেই তাকে দীর্ঘ সময় ধরে জনসম্মুখে দেখা যাচ্ছে না।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রকাশিত এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্যটি বিশ্ব গণমাধ্যমে নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি প্রখ্যাত মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব গ্লেন বেককে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।

 

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর এই ইস্যু নিয়ে কথা বলার সময় তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, মোজতবা খামেনি চিরবিদায় নিয়েছেন বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বা তথ্যগতভাবে বিশ্বাস করেন না। তবে ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক পর্যবেক্ষণ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইতোমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন, তবে এটি নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেই হবে যে ইরানের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়টি গোপন রাখার ক্ষেত্রে অভাবনীয় ও বিস্ময়কর দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।

 

তারা অত্যন্ত নিপুণভাবে এমন একটি রাজনৈতিক আবহ তৈরি করে রেখেছেন, যেন দেশের সর্বোচ্চ শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। ট্রাম্পের মতে, ইরানি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এখনও মোজতবা খামেনির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলার দাবি করছেন।

 

মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের এই ধরনের ধারাবাহিক ও আত্মবিশ্বাসী দাবির কারণেই মোজতবা খামেনির মৃত্যুর খবরটি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যথেষ্ট সন্দিহান এবং তিনি মনে করেন এর পেছনে অন্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই রহস্যজনক অন্তর্ধাল এবং তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক ধোঁয়াশার মূল সূত্রপাত ঘটে চলতি বছরের শুরুর দিকে একটি বড় সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে এক নজিরবিহীন, ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী হামলা পরিচালনা করে।

 

ওই সামরিক অভিযানের পর থেকেই মোজতবা খামেনিকে আর প্রকাশ্যে বা কোনো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেখা যায়নি। উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারি মাসের সেই ভয়াবহ হামলায় মোজতবার পিতা এবং ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।

 

পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে কিংবা রাজনৈতিক পালাবদলের মাধ্যমে মোজতবা খামেনি যখন সর্বোচ্চ নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হন বলে ধারণা করা হচ্ছিল, ঠিক তখন থেকেই তার নেতৃত্বকালীন সময়টি চরম অনিশ্চয়তা এবং রহস্যে ঘেরা।

 

রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে না আসার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতার মাসের পর মাস লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কখনোই সাধারণ কোনো ঘটনা হতে পারে না। বিশেষ করে সেটি যদি হয় ইরানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র।

 

মোজতবা খামেনির এই দীর্ঘকালীন রহস্যময় অনুপস্থিতি তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের গুজবের ডালপালা বিস্তার করতে সাহায্য করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ধারণা করছিলেন যে, ফেব্রুয়ারির ওই ভয়াবহ হামলায় হয়তো তিনিও প্রাণ হারিয়েছেন অথবা এমনভাবে শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন যা তাকে রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অক্ষম করে তুলেছে।

 

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই মন্তব্য সম্পূর্ণ পরিস্থিতিকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। একদিকে যেমন মৃত্যুর গুজব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তেমনি গুরুতর আহত অবস্থায় তার নিভৃতে চিকিৎসাধীন থাকার সম্ভাবনাটিও অত্যন্ত প্রবলভাবে সামনে চলে এসেছে।

 

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং শাসনব্যবস্থা বরাবরই অত্যন্ত কড়াকড়ি ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষমতার বলয়ে ঠিক কী ঘটছে, তা বাইরের বিশ্বের কাছে খুব সহজে উন্মোচিত হয় না।

 

মোজতবা খামেনির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো তথ্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত এই জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটার আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই। মার্কিন প্রশাসন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নিশ্চয়ই এই বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

 

তবে আপাতত গ্লেন বেককে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকারটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। মোজতবা খামেনি সত্যিই জীবিত আছেন এবং আড়ালে থেকে দেশ পরিচালনা করছেন, নাকি ইরানের কর্মকর্তারা সুকৌশলে তার মৃত্যুর বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন, তা হয়তো কেবল সময়ের পরিক্রমায় এবং ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমেই বিশ্ববাসীর সামনে পুরোপুরি পরিষ্কার হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের এই রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে অনিশ্চয়তার ঘন মেঘ বিরাজমান থাকছে।

 

- আল জাজিরা