দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর সরকার গঠনের জন্য বিরোধীদলীয় জোট এবং ইয়াশার পার্টির প্রধান গাদি আইজেনকোটকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব অর্পণ করতে যাচ্ছেন ইসরায়েলের মহামান্য প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
গত শনিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এই অত্যন্ত যুগান্তকারী এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণাটি প্রদান করেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের একটানা শাসনামলের অবসানের এক বিশাল সম্ভাবনা ও ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে রাজনীতিতে, বিশেষ করে ইসরায়েলের চরম জটিল, খণ্ডিত এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো কিছুই আগাম নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। নেতানিয়াহুর চূড়ান্ত পতন যে এখনই নিশ্চিতভাবে হয়ে গেছে, সে কথা কোনোভাবেই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।
দেশটির সংসদ বা নেসেটের আসন বণ্টন এবং দলগুলোর মধ্যকার আদর্শিক সংঘাত এতটাই তীব্র যে, যেকোনো মুহূর্তে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ উল্টে যেতে পারে। প্রখ্যাত ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ তাদের এক বিস্তারিত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, গাদি আইজেনকোট বর্তমানে তার নিজের রাজনৈতিক জোটের অন্যান্য শরিক দল, অতি রক্ষণশীল বা গোঁড়া ইহুদি রাজনৈতিক দল এবং ইসরায়েলের আরব রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করে একটি সম্মিলিত ও ঐকমত্যের সরকার গঠনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এমনকি তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির কিছু বিক্ষুব্ধ, পরিবর্তনকামী রাজনীতিককেও নিজের জোটে ভেড়ানোর এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।
ইসরায়েলের বিভক্ত সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য এই ধরনের একটি বৈচিত্র্যময় এবং পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা ছাড়া গাদি আইজেনকোটের সামনে আর কোনো সহজ বা বিকল্প পথ খোলা নেই।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আজ এক রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গাদি আইজেনকোটকে সরকার গঠনের জন্য সেই কাঙ্ক্ষিত ম্যান্ডেট বা ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। ইসরায়েলের সাংবিধানিক নিয়ম ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আইজেনকোটের হাতে সময় থাকবে ঠিক আটাশ দিন।
এই নির্ধারিত আটাশ দিনের মধ্যে তাকে অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক, দীর্ঘ আলোচনা, রাজনৈতিক দরকষাকষি এবং চূড়ান্ত সমঝোতা সম্পন্ন করে একটি কার্যকর জোট সরকার গঠন করতে হবে।
এই অত্যন্ত জটিল, স্নায়ুক্ষয়ী ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় যদি তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আশানুরূপভাবে সফল হতে না পারেন, তবে আইনি কাঠামো অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট তার নিজ ক্ষমতাবলে তাকে সরকার গঠনের জন্য আরও চৌদ্দ দিন অতিরিক্ত সময় প্রদান করতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়কালটি হবে ইসরায়েলের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত টানটান উত্তেজনার। কিন্তু এই বর্ধিত সময়ের মধ্যেও যদি আইজেনকোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠনে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হন, তখন ইসরায়েলের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন করে এক অভাবনীয় নাটকীয় মোড় আসবে।
সেই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে নতুন সরকার গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুনরায় সুযোগ পাবেন যুদ্ধাপরাধের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ফলে গাদি আইজেনকোটের সামান্যতম রাজনৈতিক ব্যর্থতা, কৌশলগত ভুল বা জোট শরিকদের মধ্যকার মান-অভিমান নেতানিয়াহুর জন্য আবারও ক্ষমতার একেবারে মূল কেন্দ্রে সগৌরবে ফিরে আসার পথ প্রশস্ত করে দিতে পারে।
‘টাইমস অব ইসরায়েল’ তাদের গভীর বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, গাদি আইজেনকোট সরকার গঠনের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পেলেও, বাস্তবে তার জন্য এই জোট গঠনের পথটি মোটেও মসৃণ, কণ্টকমুক্ত বা সহজ হবে না।
তার সামনে রয়েছে এক দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতসম বাধা ও আদর্শিক সংঘাত। এর প্রধান কারণ হলো, তার নেতৃত্বাধীন জোটে যেসব রাজনৈতিক দল বর্তমানে অবস্থান করছে, সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটি দল বাদে বাকি প্রায় প্রতিটি দলই প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর (যাদের মধ্যে অন্যতম হলো রা’আম এবং জয়েন্ট লিস্ট) সঙ্গে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক জোট গঠনের তীব্র ও দ্ব্যর্থহীন বিরোধিতা জানিয়েছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরব দলগুলোর সঙ্গে ইহুদি জাতীয়তাবাদী দলগুলোর মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ঐতিহাসিক সংঘাত অত্যন্ত প্রকট। শুধু আরব দলই নয়, আইজেনকোটের জোটের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি উদারপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ দল অতি রক্ষণশীল বা গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে একই মন্ত্রিসভায় বসে সরকার পরিচালনা করতেও ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছে।
এই ত্রিমুখী আদর্শিক সংঘাত আইজেনকোটের জন্য এক গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছে, যা থেকে বেরিয়ে আসা একজন দুর্ধর্ষ রাজনৈতিক কৌশলবিদের পক্ষেও অত্যন্ত কঠিন। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের নিজস্ব রাজনৈতিক দল ইয়াশার পার্টি গতকাল গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির যেসব সদস্য আইজেনকোটের দলের নীতি, আদর্শ ও শর্তাবলি মেনে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন, তারা চাইলে নির্দ্বিধায় আইজেনকোটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন সরকারে অংশ নিতে পারেন।
তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় গাদি আইজেনকোট একাধিকবার এবং অত্যন্ত জোরালোভাবে দেশের মানুষের সামনে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই, কোনো যুক্তিতেই তিনি ঐক্যমত্যের সরকার বা রাজনৈতিক জোট গঠন করবেন না।
নেতানিয়াহুর প্রতি তার এই চরম অনমনীয় মনোভাবের পেছনে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট, মর্মান্তিক এবং জাতীয় নিরাপত্তার চরম ব্যর্থতার কারণ। আইজেনকোট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের যে ভয়াবহ, প্রাণঘাতী ও নজিরবিহীন হামলা সংঘটিত হয়েছিল, তা ঠেকাতে যারা সামরিক ও গোয়েন্দা দিক থেকে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের আর কোনোভাবেই দেশের জনপ্রতিনিধি বা রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে আসীন থাকার ন্যূনতম নৈতিক অধিকার নেই।
ইসরায়েলের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এবং বর্ষীয়ান রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাদি আইজেনকোট যদি তার জোটের অভ্যন্তরীণ ভেদাভেদ ও ক্ষোভ প্রশমিত করে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি সফল ও কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, তবে তিনি সম্ভবত এখনই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবেন।
আরব দলগুলোর সমর্থন এক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো, তার নিজের জোটের অন্যান্য ইহুদি জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল দলগুলোর চরম অসহিষ্ণুতা এবং জাতিগত অবিশ্বাসই এই ঐক্যের পথে সবচেয়ে বড় দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে আইজেনকোট যদি এই বাধা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হন এবং সরকার গঠনের দায়িত্ব পুনরায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর হাতে ফিরে যায়, তাহলেও নেতানিয়াহু যে খুব সহজে বা বিনা বাধায় সরকার গঠন করে ফেলবেন, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ভাবমূর্তি সংকট এবং তার বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে থাকা তীব্র ক্ষোভের কারণে নেতানিয়াহুকেও ক্ষমতা ধরে রাখার এই লড়াইয়ে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে।
আর এই রাজনৈতিক দড়ি টানাটানিতে যদি গাদি আইজেনকোট এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-উভয় নেতাই শেষ পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনে পুরোপুরি ব্যর্থ হন, তবে ইসরায়েলের আইনি ব্যবস্থা অনুযায়ী দেশটিতে আবারও একটি নতুন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই ধরনের পরিস্থিতি দেশটিকে এক দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে বলে গভীরভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে।