শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অগ্রগতির দাবি ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম

ইরানের সঙ্গে চুক্তির পথে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অগ্রগতির দাবি ট্রাম্পের
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও কূটনীতির মঞ্চে এক নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মোড় নেওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ইরানের সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ওয়াশিংটন ‘অভূতপূর্ব এবং অনেক বড় ধরনের অগ্রগতি’ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা চরম বৈরিতা ও উত্তেজনার পারদের কিছুটা অবনতি ঘটিয়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরানও এই মুহূর্তে তাদের পূর্বের অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে একটি যৌক্তিক ও নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রবলভাবে আগ্রহী।

 

শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে অত্যন্ত খোলামেলা আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই চাঞ্চল্যকর ও যুগান্তকারী দাবিটি করেন। বিশ্বখ্যাত কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত ও বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে শনিবার (৭ নভেম্বর) এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি প্রকাশ্যে আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতময় ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের এক বিরাট আশার জন্ম দিয়েছে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দেওয়া এই বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক বৈরিতা, পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাহাড় থাকা সত্ত্বেও, পর্দার অন্তরালে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এক ধরনের গঠনমূলক ও ধারাবাহিক সংযোগ স্থাপিত হয়েছে।

 

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা, চুক্তির শর্ত বা লিখিত কোনো চুক্তিনামা প্রকাশের বিষয়ে মুখ না খুললেও তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

 

ট্রাম্প বলেন, "আমরা বর্তমানে তাদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি এবং তারা প্রকৃতপক্ষে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে চায়।" বিগত কয়েক বছর ধরে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে চরম আস্থার সংকট ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা বিরাজ করছিল, ট্রাম্পের এই বক্তব্য সেই দীর্ঘস্থায়ী বরফ গলার প্রথম সুস্পষ্ট, আনুষ্ঠানিক ও ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

 

তবে কূটনৈতিক এই অভাবনীয় অগ্রগতির দাবির পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের চিরচেনা কঠোর, অনড় এবং আপসহীন অবস্থানের কথাও অত্যন্ত জোরালোভাবে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

 

তিনি কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই অকপটে স্বীকার করেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি সামরিক সরঞ্জাম, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৌশলগত ঘাঁটির ওপর বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট, নিখুঁত ও তাঁর ভাষায় ‘ছোটখাটো’ আক্রমণ পরিচালনা করেছে।

 

এই প্রসঙ্গে তিনি একটি অত্যাধুনিক ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল সিস্টেম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার কথা বিশেষভাবে এবং সগর্বে উল্লেখ করেন। যদিও এই নির্ভুল সামরিক হামলাটি ঠিক কখন, কীভাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোন সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানে সংঘটিত হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা কৌশল এবং সামরিক গোপনীয়তার কারণেই কোনো পরিষ্কার বা নির্দিষ্ট তথ্য গণমাধ্যমের সামনে উন্মুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান।

 

এই সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের ক্ষিপ্রতা, নির্ভুলতা এবং মার্কিন বাহিনীর সক্ষমতা বোঝাতে গিয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "তারা অত্যন্ত সুকৌশলে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান বিধ্বংসী যন্ত্র বা অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল।

 

কিন্তু আমাদের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এতই তৎপর যে, আমরা সেটি রাডারে শনাক্ত করার পর মাত্র পনেরো মিনিট, এমনকি হতে পারে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে তা ধ্বংস করে দিয়েছি।"

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বাধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন প্রযুক্তি এবং যেকোনো মুহূর্তে তাৎক্ষণিক আক্রমণ পরিচালনার একচ্ছত্র ক্ষমতার একটি প্রচ্ছন্ন ও কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সমরবিদরা।

 

এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মার্কিন প্রশাসন আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি থাকলেও, তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং যেকোনো মুহূর্তে আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শনে বিন্দুমাত্র পিছপা হচ্ছে না।

 

সামরিক পদক্ষেপ এবং প্রত্যক্ষ শক্তি প্রদর্শনের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর হাতিয়ার যে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ বা স্যাংশন’, সেটিও অত্যন্ত বিশদভাবে উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সংবাদ সম্মেলনে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, সরাসরি কোনো সর্বাত্মক সামরিক যুদ্ধে না জড়িয়েও তারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তেহরানের সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু ও দিশেহারা করে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

 

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই লাগাতার শাস্তিমূলক অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে বিশ্বের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড়, ভয়াবহ এবং কঠোর অবরোধ’ বলে আখ্যায়িত করেন। এই সর্বাত্মক, নজিরবিহীন এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনীতি চরম বিপর্যয় ও খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

 

ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর নীতির কারণেই ইরান আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিজের দাবির সপক্ষে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে ট্রাম্প জানান যে, দেশটি বর্তমানে প্রায় ৩০০ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মতো এক অকল্পনীয় ও চরম ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে।

 

এই ৩০০ শতাংশ আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির সরাসরি অর্থ হলো, সাধারণ ইরানি নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং মুদ্রার মান সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বাধা এবং আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে দেশটির সাধারণ নাগরিক, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়েছে।

 

আর এই চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা ও সামাজিক অস্থিরতাকেই মার্কিন প্রশাসন তাদের ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ বা ম্যাক্সিমাম প্রেশার নীতির অন্যতম বড় ও কৌশলগত ‘সফলতা’ হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এই তীব্র অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটই মূলত তেহরানকে বাধ্য করেছে তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক কর্মসূচি নিয়ে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে।

 

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী ছায়াযুদ্ধ এবং প্রক্সি সংঘাতে মার্কিন বাহিনীর কোনো ধরনের প্রাণহানি না হওয়ার স্পর্শকাতর বিষয়টিকে নিজের প্রশাসনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

গত সাত মাসের সামরিক তৎপরতার পরিসংখ্যান টেনে তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে দাবি করেন, এই দীর্ঘ ও চরম উত্তেজনাকর সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সদস্যেরও প্রাণহানি ঘটেনি বা আমেরিকার কোনো সন্তানের রক্ত ঝরেনি।

 

বিশ্বমঞ্চে চলা অন্যান্য সংঘাত, বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক বিধ্বংসী যুদ্ধের সঙ্গে বর্তমান মার্কিন-ইরান পরিস্থিতির একটি সরাসরি তুলনা টানেন তিনি।

 

ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, "আমরা তাদের মতো কোনো সর্বাত্মক লড়াই বা প্রথাগত ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ করছি না।" মার্কিন প্রেসিডেন্ট বর্তমান পরিস্থিতিকে গতানুগতিক ‘যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে সুস্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকৃতি জানান।

 

ট্রাম্পের মতে, এটি কোনো যুদ্ধ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ও অর্থনৈতিক পেশিশক্তি ব্যবহার করে বিনা রক্তপাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

 

একই সঙ্গে আলোচনার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে তিনি একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ, অভাবনীয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ দাবি করে বসেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার সামরিক চাপ, নজরদারি ও অবরোধের মুখে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ইরানের নৌবাহিনী কার্যত সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

যদিও এই বিশাল ও চাঞ্চল্যকর দাবির সপক্ষে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বা অন্য কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষক সংস্থার বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা উপাত্ত তিনি সেই মুহূর্তে উপস্থাপন করেননি।

 

তবে আল জাজিরার এই সময়োপযোগী প্রতিবেদন থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন ইরানের ওপর চরম অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের নীতি পূর্ণমাত্রায় অব্যাহত রেখেছে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তেহরানের সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় পৌঁছানোর জন্য আলোচনার পথও সম্পূর্ণ খোলা রেখেছে।

 

বিশ্ব সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই প্রথাগত দ্বিমুখী নীতি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো শান্তি বয়ে আনতে সক্ষম হয় কি না।

 

- আল জাজিরা