শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অনাকাঙ্ক্ষিত, ডেমোক্র্যাট নেতার কড়া সমালোচনা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ অনাকাঙ্ক্ষিত, ডেমোক্র্যাট নেতার কড়া সমালোচনা
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং উত্তেজনাকর অঞ্চল হলো মধ্যপ্রাচ্য। এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভূমিকা এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন নানা আলোচনা, সমালোচনা এবং বিতর্কের ঝড় বইছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক জোরালো ও সাহসী ভিন্নমতের উত্থান ঘটেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত মুসলিম সিনেটর এবং ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আবদুল এল-সায়েদ দেশটির চলমান মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং বিশেষ করে সদ্য শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর মার্কিন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

 

সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন যে, ইরানের সাথে বর্তমান এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনোভাবেই এই আত্মঘাতী এবং অবিবেচক সংঘাতে জড়ানো উচিত হয়নি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তার এই বক্তব্যকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক ঐতিহাসিক, বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী পর্যালোচনা হিসেবে অভিহিত করছেন। ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা ও স্নায়ুযুদ্ধ কয়েক দশকের পুরোনো হলেও, সরাসরি সামরিক সংঘাত সবসময়ই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এড়িয়ে চলেছে ওয়াশিংটন।

 

কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়ম ও কৌশলগত সতর্কতা ভেঙে এক বিপজ্জনক পথে পা বাড়িয়েছে। ডেমোক্র্যাট নেতা ও সিনেটর এল-সায়েদ উদ্ভূত এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ভয়ংকর ফাঁদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী, ব্যয়বহুল এবং জটিল সংঘাতে প্রবেশ করেছে, যেখান থেকে সহজে বা সম্মানজনকভাবে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। তার মতে, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা-তাঁরা ডেমোক্র্যাট হোন বা রিপাবলিকান-সবাই অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ইরানের সাথে সরাসরি সামরিক যুদ্ধ এড়িয়ে গেছেন।

 

কারণ তারা ভালো করেই জানতেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো চরম অস্থিতিশীল অঞ্চলে নতুন করে কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে তা কেবল ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিন প্রভাবের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

 

কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সেই পূর্ববর্তী সতর্ক, পরিপক্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে এক ঐতিহাসিক এবং বড় ধরনের কৌশলগত ভুল করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে মিত্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের একচেটিয়া প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক রাজনৈতিক মহলে কানাঘুষা ও সমালোচনা থাকলেও, একজন শীর্ষস্থানীয় ক্ষমতাসীন সিনেটর হিসেবে আবদুল এল-সায়েদ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।

 

তিনি সরাসরি ও কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েলের বর্তমান কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত সংবেদনশীল সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত গোপন ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন।

 

এল-সায়েদের সুস্পষ্ট দাবি, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী সুকৌশলে এবং নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটনকে এই যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছেন। তিনি দেশবাসীকে আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং কয়েক দশক ধরেই ইসরায়েলি নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে নানা কূটকৌশলের মাধ্যমে চেষ্টা করে আসছিল যেন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে অবতীর্ণ হয়।

 

তার এই ভয়হীন বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং সেখানে বিদেশি রাষ্ট্রের অবাঞ্ছিত ও অনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এক গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করে এল-সায়েদ ইসরায়েলকে দেওয়া বিশেষ ছাড় বা ইমিউনিটির ঘোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধনীতি এবং মানবাধিকারের মানদণ্ডে বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন দেশের সরকারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যেমন কড়া জবাবদিহিতা দাবি করে, ঠিক একইভাবে ইসরায়েলি সরকারকেও সেই একই আইনি ও নৈতিক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কোনো বিশেষ রাষ্ট্রকে অন্ধভাবে সমর্থন দেওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক, যৌক্তিক ও রাজনৈতিক পার্থক্য তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে স্পষ্ট করে বলেন, কোনো দেশের সরকারের ভুল নীতি বা আগ্রাসী পদক্ষেপের সমালোচনা করার অর্থ কখনোই সেই দেশের সাধারণ জনগণ কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণা পোষণ করা বোঝায় না।

 

রাজনৈতিক সমালোচনা এবং জাতিগত বা ধর্মীয় শত্রুতা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়-এই সত্যটি অনুধাবনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে যেকোনো মিত্র বা বৈরী দেশের সরকারের সমালোচনা করাটা একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার, যাকে কোনোভাবেই ইহুদিবিদ্বেষ বা অন্য কোনো সস্তা রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দমিয়ে রাখা অনুচিত।

 

এল-সায়েদ তার এই সুচিন্তিত সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন সমরাস্ত্র বিক্রি এবং প্রায় শর্তহীন সামরিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টিরও তীব্র আইনি ও নৈতিক বিরোধিতা করেছেন। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে এই আত্মঘাতী নীতি জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে নিজেকে মানবাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে দাবি করে থাকে; অথচ তাদেরই সরবরাহকৃত শত শত কোটি ডলারের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।

 

এই মারণাস্ত্রগুলো নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, শিশু হত্যা বা যুদ্ধাপরাধের মতো ভয়াবহ ও অমানবিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী যাচাই ও নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

 

যদি এটা প্রমাণিত হয় যে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে চরমভাবে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, তবে সেই জঘন্য অপরাধের দায়ভার কোনোভাবেই ওয়াশিংটনের পক্ষে এড়ানো সম্ভব নয়। এটি কেবল মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চরম নৈতিক পরাজয়ই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে বলে তিনি মনে করেন।

 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনার পরিধিতে এল-সায়েদ কেবল ইরান বা ইসরায়েলের ইস্যুতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং কৌশলগত মিত্র মিশরের নাজুক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও গভীর ও স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

এই প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেতা মনে করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেকোনো ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিকভাবে একটি অভিন্ন ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা উচিত। মিশরের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধী দল কঠোরভাবে দমন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, গুম, খুন এবং বিনাবিচারে আটকের মতো অত্যন্ত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অগণিত অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো করে আসছে।

 

এই উদ্বেগজনক প্রেক্ষাপটে এল-সায়েদ অত্যন্ত জোরালোভাবে এই দাবি উত্থাপন করেছেন যে, মিশরের মতো যেসব রাষ্ট্র দিনের পর দিন ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে, তাদেরকে দেওয়া মার্কিন জনগণের করের টাকার বিপুল আর্থিক ও সামরিক সহায়তা অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে বন্ধ করা উচিত।

 

সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের কষ্টার্জিত করের টাকায় বিদেশের মাটিতে কোনো স্বৈরতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক বা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সরকারকে টিকিয়ে রাখা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও নাগরিকদের মৌলিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

পরিশেষে, সিনেটর আবদুল এল-সায়েদের এই অত্যন্ত বিস্তারিত, তথ্যনির্ভর এবং কড়া সমালোচনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে এক নতুন আদর্শিক মেরুকরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

প্রথাগতভাবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব সবসময়ই মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে প্রায় শর্তহীন সমর্থন দিয়ে আসলেও, এল-সায়েদের মতো তরুণ ও নতুন প্রজন্মের নেতাদের এই সাহসী অবস্থান প্রমাণ করে যে, দলের ভেতরে নীতিগত পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

 

তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে সম্পূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার অনুকূলে। মধ্যপ্রাচ্যে অযাচিত সামরিক হস্তক্ষেপ এবং একের পর এক দেশের ওপর আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বা কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না।

 

বরং গঠনমূলক কূটনীতি, মানবাধিকারের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল বিশ্বমঞ্চে একটি টেকসই ও সম্মানজনক বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এল-সায়েদের এই সুচিন্তিত এবং নির্ভীক বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।