বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কট্টরপন্থী সামরিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা অবিলম্বে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালানোর জন্য জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, ইরানে নতুন করে আক্রমণ চালানোর জন্য হোয়াইট হাউসের হাতে থাকা সময় অত্যন্ত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
আগামী জানুয়ারি মাসে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের হাতে। আর ডেমোক্র্যাটরা একবার আইনসভার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিলে, প্রেসিডেন্টের পক্ষে নতুন করে কোনো সামরিক সংঘাত শুরু করা কিংবা চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে যাবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ শনিবার প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এনবিসি নিউজের ওই প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক এবং সামরিক উপদেষ্টামণ্ডলী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গত বৃহস্পতিবার এক অত্যন্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন।
সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তারা প্রেসিডেন্টকে এই চরম বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার একচ্ছত্র ক্ষমতার মেয়াদ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। উপদেষ্টাদের এই মূল উদ্বেগের কারণ হলো আসন্ন জানুয়ারি মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো অনুযায়ী আইনসভা বা কংগ্রেসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক খাতের বাজেট অনুমোদনের ক্ষেত্রে। কট্টরপন্থী উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে সতর্ক করে স্পষ্টভাবে বলেছেন, আগামী জানুয়ারি মাসে যখন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেবে, তখন তারা যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে।
ডেমোক্র্যাটরা তখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপর নানামুখী আইনি তদন্ত শুরু করতে পারে, সামরিক খাতের অর্থ ছাড়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে এবং যুদ্ধবিরোধী নতুন রেজ্যুলেশন বা আইনি প্রস্তাব পাস করে যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনাকে একপ্রকার অসম্ভব করে তুলবে।
তাই কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে হলে তা এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত সংরক্ষিত ওভাল অফিসে অনুষ্ঠিত ওই অতি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বৈঠকে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন বর্তমান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেটে হেগসেথ এবং সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী সেনাপ্রধান জেনারেল ডেন কেইন। এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেটে হেগসেথ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কালক্ষেপণ না করে ইরানে নতুন করে সর্বাত্মক সামরিক হামলা চালানোর জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করেন।
হেগসেথের মতে, ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতাকে এখনই গুঁড়িয়ে দেওয়া না হলে ভবিষ্যতে তা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তবে প্রশাসনের ভেতরে সবাই যে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই চরমপন্থী সামরিক সমাধানের সাথে একমত, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
ওই একই বৈঠকে উপস্থিত অন্য কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ও মধ্যপন্থী উপদেষ্টা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আগ্রাসী প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, এই মুহূর্তে ইরানের ওপর নতুন করে কোনো সামরিক হামলা চালানো হলে তা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় চলমান উত্তেজনা নিরসন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের সামান্যতম যে সুযোগ অবশিষ্ট রয়েছে, তা চিরতরে ধ্বংস করে দেবে।
মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ এই তীব্র মতবিরোধের চিত্রটি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামরিক হামলার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন, অন্যদিকে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথে হেঁটে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো প্রলয়ংকরী সংঘাত এড়ানোর জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অগ্রসর হচ্ছেন। তিনি পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন এবং ইরানের সাথে অর্থবহ আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জেডি ভান্স গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, এই মুহূর্তে ইরানের মতো একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তাই তিনি ধ্বংসাত্মক সামরিক সংঘাতের বদলে গঠনমূলক ও বাস্তবসম্মত আলোচনার পথটিকেই অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে এনবিসি নিউজ তাদের নিজস্ব সামরিক বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে এই শঙ্কার কথাও জানিয়েছে যে, হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক যাই হোক না কেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থীদের পরামর্শ মেনে ইরানে হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ প্রদান করেন, তবে সেই সামরিক অভিযানটি গতানুগতিক কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হবে না।
বরং এই আক্রমণ হবে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য, কিন্তু এর ধ্বংসক্ষমতা ও তীব্রতা হবে অভাবনীয় ও ভয়ংকর। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদরা সম্ভাব্য এই হামলার জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তু ইতোমধ্যে নির্ধারণ করে রেখেছেন।
এই সম্ভাব্য হামলার মূল টার্গেট হবে ইরানের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তাদের সুবিশাল তেল ও গ্যাস উত্তোলন এবং পরিশোধন কেন্দ্রগুলো। এর পাশাপাশি ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত পারমাণবিক অবকাঠামোগুলো এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ‘পিকঅ্যাক্স’ পাহাড়কে এই ব্যাপক হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ধরনের সুনির্দিষ্ট হামলার মূল উদ্দেশ্য হলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক মেরুদণ্ডকে এমনভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, যাতে তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
এই চরম সংবেদনশীল ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদনের বিষয়ে মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত সতর্ক ও পরিমাপিত একটি জবাব প্রদান করেছেন।
তিনি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের টেবিলে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক সব ধরনের অপশন বা বিকল্পই সম্পূর্ণভাবে খোলা রাখা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই কথাটিও জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই মুহূর্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেবল একজনের হাতেই ন্যস্ত রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখন, কীভাবে এবং ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, সেই বিষয়টি একমাত্র তিনিই জানেন। এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগ পর্যন্ত পুরো বিষয়টি এক ধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতার মধ্যেই রাখা হবে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের একটি সুপরিচিত ও কার্যকর কৌশল।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক চরম উৎকণ্ঠার সময় হতে চলেছে, যেখানে হোয়াইট হাউসের একটিমাত্র সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ।