শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানে মার্কিন বাহিনীর ‘সীমিত’ সামরিক হামলা হয়েছে - ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম

ইরানে মার্কিন বাহিনীর ‘সীমিত’ সামরিক হামলা হয়েছে - ট্রাম্প
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং চলমান উত্তেজনার পারদ আবারও এক নতুন এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সমাপ্ত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক দিনের মাথায়, ইরানের মাটিতে একটি ‘সীমিত মাত্রার’ সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

শুক্রবার তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের অত্যন্ত সংবেদনশীল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে এই আকস্মিক ও অভাবনীয় হামলা পরিচালনা করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত ও বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর মার্কিন প্রশাসনের এই সামরিক পদক্ষেপ মূলত বিশ্বমঞ্চে নিজেদের হারানো আধিপত্য এবং কঠোর অবস্থান ধরে রাখার একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত বার্তা।

 

যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বয়ং তাঁর প্রশাসনের এই সর্বশেষ সামরিক পদক্ষেপটিকে অত্যন্ত ‘সামান্য’ বা ক্ষুদ্র পরিসরের একটি অভিযান বলে বিশ্বের সামনে অভিহিত করেছেন, তবুও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

শুক্রবার নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পোস্ট করা এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার বিষয়টি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে নিয়ে আসেন।

 

ওই আনুষ্ঠানিক বার্তায় তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সরাসরি নির্দেশনার ভিত্তিতে ইরানের ভূখণ্ডে একটি ‘সীমিত মাত্রায়’ সফল সামরিক হামলা পরিচালনা করেছে এবং এই সুনির্দিষ্ট হামলায় মূলত ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে ওই দিনই হোয়াইট হাউসে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অভিযানের আরো কিছু চাঞ্চল্যকর ও রোমাঞ্চকর তথ্য প্রকাশ করেন। নিজস্ব সামরিক বাহিনীর অতুলনীয় সক্ষমতার কথা তুলে ধরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইরানি সামরিক বাহিনী একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ছোট আকারের বিমান বিধ্বংসী যন্ত্র তৈরি ও স্থাপন করেছিল।

 

কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা রাডারে সেটি ধরা পড়ার পর অত্যন্ত নিখুঁত ও দ্রুততার সঙ্গে মাত্র পনেরো মিনিট, এমনকি হতে পারে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী সেটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দম্ভোক্তি ও দাবির পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুক্রবার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং বার্তা সংস্থাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদ প্রচার করেছে যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি বিকট ও ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

 

উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালির এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক ও স্নায়বিক সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, কারণ এই সামুদ্রিক জলপথটি দিয়ে বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়।

 

এই সুজা এলাকায় বিস্ফোরণের খবরের পাশাপাশি স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে যে, এর আগে গত সোমবার কেশম দ্বীপ, পার্শ্ববর্তী হাঙ্গাম দ্বীপ এবং মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাস এলাকায় বেশ কয়েকটি সন্দেহজনক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল।

 

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে অবশ্য এই সামরিক পদক্ষেপটিকে সম্পূর্ণ ‘আত্মরক্ষামূলক’ একটি পূর্বসতর্কতামূলক হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়মিত টহল বিমান ও নৌযানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ধ্বংস করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

 

তবে সামরিক এই সংঘাতের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সদ্য সমাপ্ত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি যে বিশাল ও অভাবনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মূলত ইরানের সঙ্গে চলমান এই প্রলম্বিত সামরিক উত্তেজনা এবং এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের লাগামহীন উচ্চমূল্য।

 

সাধারণ মার্কিন ভোটাররা এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ক্রমাগত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্ষমতাসীন প্রশাসনের ওপর নিজেদের তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ব্যালটের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, যার ফলে অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচক ও খাতকেই অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

 

এই নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার রাজনৈতিক বক্তৃতাগুলোতে বারবার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে আসছেন।

 

তবে একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এক ধরনের রহস্যময় দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে বারবার এই ইঙ্গিতও দিয়ে চলেছেন যে, হয়তো খুব শিগগিরই এই চলমান সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে যাচ্ছে।

 

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতা এবং বিরোধের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো অত্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রবল আশঙ্কা, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি।

 

ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এটি পরিষ্কার করে আসছে যে, দুই দেশের মধ্যকার বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে যেকোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর পূর্বশর্ত হিসেবে অবশ্যই এই পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান হতে হবে।

 

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মার্কিন প্রশাসন কেবল সামরিক হামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং গোয়েন্দা তৎপরতাতেও এক নতুন ও অভাবনীয় মাত্রা যোগ করেছে। শুক্রবার গভীর রাতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড, যা আন্তর্জাতিক মহলে সংক্ষেপে ‘সেন্টকম’ নামে পরিচিত, তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ পোস্ট করা এক অভাবনীয় বার্তায় ঘোষণা করেছে যে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপন ও সংবেদনশীল তথ্যের বিনিময়ে বিশাল অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার প্রদান করবে।

 

এই কর্মসূচির আওতায় ইরানের বিভিন্ন গোপন পারমাণবিক স্থাপনা, সেখানে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে ইরানের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সদস্যদের গতিবিধি অথবা এসব সরঞ্জাম ও বিজ্ঞানীদের স্থানান্তর সংক্রান্ত যেকোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদানকারীকে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পর্যন্ত বিশাল অঙ্কের পুরস্কার দেওয়া হবে।

 

এমনকি ওই অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদানকারীর জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে অন্য কোনো নিরাপদ দেশে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের সম্পূর্ণ সুবিধাও দেওয়ার সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

 

মার্কিন সেন্টকমের ওই রোমাঞ্চকর পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পরিচালিত বিখ্যাত ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ বা ন্যায়ের জন্য পুরস্কার নামক কর্মসূচির একটি সরাসরি ওয়েবলিঙ্কও যুক্ত করা ছিল, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মার্কিন প্রশাসন এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কতটা মরিয়া ও বদ্ধপরিকর।

 

তবে সামরিক অভিযান পরিচালনা, প্রকাশ্য ধ্বংসের হুমকি এবং এত বিপুল অঙ্কের আর্থিক পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে এক নজিরবিহীন ও সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করলেও, কূটনীতির দরজা একেবারে বন্ধ করে দেয়নি ওয়াশিংটন।

 

শুক্রবার দিনের শুরুতে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে অত্যন্ত প্রাণবন্ত আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এতসব সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার সমান্তরালে তৃতীয় পক্ষের বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের গোপন কূটনৈতিক আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

 

ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইরানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি যে, সমাধানের একটি কার্যকর পথ খুঁজে বের করার স্বার্থে আমাদের এই আলোচনা আগামী দিনেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে।

 

সামরিক পরাশক্তিগুলোর এই ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ এবং একই সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসে থাকার এই বহুমুখী কৌশল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অত্যন্ত জটিল ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত বহন করে।

 

- এএফপি, ফার্স্টপোস্ট