দীর্ঘ কয়েকমাস ধরে চলা এই নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শনিবার ইরানের সামরিক বাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় মুখপাত্রের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি বা আইআরএনএ এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সতর্কবার্তাটি প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির এই জটিল সমীকরণে ইরানের এই দাবি বিশ্বনেতাদের জন্য এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে ইরান নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক বার্তা প্রদান করতে চাইছে।
দেশটির সামরিক বাহিনীর অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিজেদের বর্তমান সামরিক অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন যে, আজকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি শাসকদের সাথে দীর্ঘ কয়েক মাসের সরাসরি সংঘাত থেকে যে বাস্তব ও অমূল্য রণকৌশলগত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
তার মতে, গত কয়েক মাসের এই সামরিক বোঝাপড়া এবং সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ইরানি বাহিনীকে কেবল রক্ষ্মণাত্মক অবস্থান থেকেই বের করে আনেনি, বরং যুদ্ধের শুরুর দিকের তুলনায় তারা এখন প্রযুক্তিগত, কৌশলগত এবং আক্রমণাত্মক দিক দিয়ে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী এক অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে বিশ্বের অন্যতম সেরা দুটি সামরিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরান যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা তাদের সামরিক বাহিনীর কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের সুযোগ করে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া তার বক্তব্যে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বর্তমান মানসিক অবস্থার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে উল্লেখ করেন যে, ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মাঝে বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় দেশপ্রেমের প্রেরণা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি অবিচল প্রতিশ্রুতি এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দুর্ভেধ্য আত্মবিশ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে।
একটি দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দৃঢ়তা অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যখন তারা মাসের পর মাস ধরে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সামরিক হামলার বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে।
তার এই বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, তেহরান শুধু তাদের অস্ত্রভাণ্ডার বা সামরিক সরঞ্জামের ওপরই নির্ভর করছে না, বরং তাদের সেনাবাহিনীর উচ্চ মনোবল এবং অটুট মানসিকতাকেও এই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে, যা যেকোনো আধুনিক যুদ্ধে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে এবং তাদের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুর ওপর ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলার মাধ্যমে এই সাম্প্রতিক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
প্রথম দিকের সেই ভয়াবহ ও আকস্মিক হামলার পর থেকে গত কয়েক মাস ধরে এই যুদ্ধ একটি চরম সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো বিজয় অর্জন করতে পারেনি, বরং এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে এবং প্রতিপক্ষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে তেহরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে সীমিত করার মতো একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মোট জ্বালানি তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়ে থাকে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই অবরোধ বা নৌ চলাচল সীমিত করার চেষ্টার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এক মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।
মোহাম্মদ আকরামিনিয়া তার সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই কৌশলগত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর বর্তমানে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বহাল রয়েছে।
তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত তেহরানের যৌক্তিক এবং ন্যায্য দাবিগুলো মেনে না নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল এভাবেই বন্ধ বা সীমিত থাকবে।
ইরানের এই অনড় অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে, কারণ এই জলপথটি বিকল্পহীন এবং এর ওপর যেকোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির সম্মুখীন করে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার নির্দেশের কথা উল্লেখ করে আকরামিনিয়া আরও বলেন যে, শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত তাৎক্ষণিক, চরম মাত্রায় কার্যকর এবং এর কোনো ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
এর অর্থ হলো, ইরান কেবল নিজেদের ভূখণ্ডের ভেতরেই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে না, বরং প্রয়োজন হলে শত্রুপক্ষের যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক স্বার্থের ওপর বিনা দ্বিধায় আঘাত হানতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
এই ধরনের সীমাহীন ও উন্মুক্ত যুদ্ধের হুমকি প্রমাণ করে যে তেহরান এই সংঘাতে যেকোনো পর্যায় পর্যন্ত যেতে মানসিকভাবে প্রস্তুত এবং তারা তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করতে রাজি নয়।
এদিকে, সংঘাতের এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালির অত্যন্ত কৌশলগত স্থানে অবস্থিত ইরানের নিজস্ব দ্বীপ কেশমে হামলার খবর মার্কিন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অত্যন্ত সুরক্ষিত কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের ছোড়া অন্তত দুটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তীব্র শক্তিতে আঘাত হেনেছে। দ্বীপটিতে ঠিক কী পরিমাণ সামরিক বা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা সেখানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তবে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ওই দ্বীপে পর পর দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর নিশ্চিত করেছে, যা মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের দাবির সত্যতা প্রমাণ করে। এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অভাবনীয় সাফল্যের খবরও সামনে এসেছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম অত্যন্ত গর্বের সাথে জানিয়েছে যে, শনিবার ভোরের দিকে যখন একটি মার্কিন সামরিক ড্রোন গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর উদ্দেশ্যে কেশম দ্বীপের আকাশে উড়ছিল, তখন ইরানি সেনাবাহিনীর অত্যন্ত সতর্ক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিখুঁত নিশানার মাধ্যমে ড্রোনটিকে আঘাত হেনে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
ইরানের এই সফল ড্রোন বিধ্বংসী অভিযান তাদের আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতা এবং রাডার প্রযুক্তির উন্নতির একটি বড় প্রমাণ। যদিও ড্রোন ভূপাতিত করার এই খবরটি ঘটা করে প্রচার করা হয়েছে, তবে কেশম দ্বীপে আদতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনে সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে কি না, সে বিষয়ে তেহরান এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান সংঘাত আপাতত কমার কোনো লক্ষণ তো নেই-ই, বরং দুই পক্ষের অনড় অবস্থান এবং নিত্যনতুন সামরিক আঘাত ও পাল্টা আঘাতের কারণে পরিস্থিতি ক্রমশ একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকেই ধাবিত হচ্ছে।