ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (যাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংক্ষেপে আইআরজিসি বলা হয়) মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র বিভাগের কমান্ডারের অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেলালি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের বর্তমান অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন শক্তির মূল ভিত্তি হলো সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থন।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক নানা বিধিবিধান ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও ইরানের এই সামরিক ও প্রতিরক্ষা শক্তি দিন দিন কেবল বেড়েই চলেছে, যা যেকোনো আগ্রাসী শক্তির জন্য এক বিশাল চিন্তার কারণ হতে বাধ্য।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি-র সম্প্রচারিত এক বিশেষ সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা পার্সটুডে তাদের সাম্প্রতিক এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তাৎপর্যপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত বার্তাটি প্রকাশ্যে এনেছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ইরান কীভাবে এমন সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত হলো, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিস্তর আলোচনা ও গবেষণা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে প্রায়শই উঠে আসে যে, বাইরের পৃথিবী থেকে অস্ত্র ক্রয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই মূলত ইরান বাধ্য হয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মেধা, প্রকৌশলী এবং সম্পদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে শুরু করে।
আর এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিকেই তারা এক অনন্য জাতীয় সুযোগে পরিণত করেছে। আইআরজিসির এই পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ঠিক এই স্পর্শকাতর জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি আলোকপাত করেছেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেলালি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, সমরাস্ত্র বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক ড্রোন উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ইরান আজ সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ইরান এখন আর কেবল অন্য কোনো দেশের প্রযুক্তি অনুকরণ করে বা বাইরের কোনো রাষ্ট্রের কারিগরি সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নকশা প্রণয়ন এবং উৎপাদন করছে না; বরং তারা এক ধাপ এগিয়ে এগুলোর নেভিগেশন বা নির্ভুল দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা, সুনিপুণ পরিচালনা পদ্ধতি এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল প্রযুক্তিগুলোও পুরোপুরি নিজেদের একচ্ছত্র আয়ত্তে নিয়ে এসেছে।
এর অর্থ হলো, সামরিক আকাশযান ও দূরপাল্লার মারণাস্ত্রের প্রাথমিক গবেষণাগার থেকে শুরু করে কারখানার উৎপাদন রেখা এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা পর্যন্ত পুরো কার্যক্রমে বিদেশের বা বাইরের কোনো শক্তির ওপর ইরানের বিন্দুমাত্র নির্ভরশীলতা অবশিষ্ট নেই।
একটি উন্নয়নশীল ও অবরুদ্ধ অর্থনীতির দেশের জন্য সামরিক প্রযুক্তিতে এমন অভূতপূর্ব স্বয়ংসম্পূর্ণতা আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞদেরও গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আধুনিক যুদ্ধকৌশলে চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোনের ভূমিকা যখন সমগ্র বিশ্বে অত্যন্ত নির্ণায়ক হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়ে ইরানের ড্রোনশিল্পের সংখ্যাগত ও গুণগত অভাবনীয় অগ্রগতির কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন আইআরজিসির এই শীর্ষ উপদেষ্টা।
তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, ড্রোন প্রযুক্তিতে ইরান বর্তমানে এমন এক উচ্চ পর্যায়ের সক্ষমতা অর্জন করেছে, যার মাধ্যমে তারা কেবল আঞ্চলিক পর্যায়েই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বপরিসরেও নিজেদের সামরিক শক্তি, কৌশল ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের পূর্ণ সামর্থ্য রাখে।
আকাশ প্রতিরক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে একটানা অবস্থান করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শত্রুপক্ষের গতিবিধির তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ড্রোন থেকে শুরু করে, শত শত মাইল দূরের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আত্মঘাতী বা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম ধ্বংসাত্মক আক্রমণাত্মক ড্রোন-প্রায় সব ধরনের চালকবিহীন আকাশযান তৈরিতেই ইরান আজ এক ঈর্ষণীয় ও আন্তর্জাতিক মানের অগ্রগতি অর্জন করেছে।
আধুনিক রাডারে সহজে ধরা না পড়া, যেকোনো বৈরী আবহাওয়ায় টিকে থাকার সক্ষমতা এবং অত্যন্ত দ্রুতগতির কারণে ইরানের এই নিজস্ব প্রযুক্তির সামরিক ড্রোনগুলো বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্যও এক বিরাট কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ক্রমবর্ধমান বহুমুখী সামরিক সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যকে ইতিমধ্যেই অনেকটাই পরিবর্তন করে দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর এই বিপুল সক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ও দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বেলালি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এগুলো কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর অযাচিত আক্রমণ বা বিনা উসকানিতে আগ্রাসন চালানোর জন্য তৈরি করা হয়নি।
বরং, এই অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। যেকোনো দেশের জন্য তার নিজস্ব ভৌগোলিক অখণ্ডতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হলো প্রধান অগ্রাধিকার।
আর সামরিক শক্তির এই বিশাল সমর প্রস্তুতির প্রধান লক্ষ্যও ঠিক তা-ই। একইসঙ্গে, বহির্বিশ্বের যেকোনো শত্রুভাবাপন্ন পক্ষ বা রাষ্ট্র যেন ইরানের দিকে চোখ তুলে তাকাতে বা কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানোর সামান্যতম দুঃসাহস দেখাতে না পারে, সেই সুদৃঢ় ভীতি বা কৌশলগত প্রতিরোধক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আইআরজিসির মূল রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল।
তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এবং কড়া সুরে এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, বিশ্বের কোনো পরাশক্তিকেই ইরানের পবিত্র ভূখণ্ড এবং এর সার্বভৌম আকাশসীমার ওপর সামান্যতম হস্তক্ষেপ করার সুযোগ বা আইনি অধিকার কখনোই দেওয়া হবে না।
যদি কোনো রাষ্ট্র বা জোট এমন কোনো অপরিণামদর্শী সামরিক বা গোয়েন্দা পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে তাকে এই শক্তিশালী নিজস্ব সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই অত্যন্ত দ্রুত এবং দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে।
সামরিক হার্ডওয়্যার, অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের বাইরে গিয়ে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও শক্তিমত্তা রক্ষায় সাধারণ মানুষের অনন্য ও অপরিহার্য ভূমিকার কথাও অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেছেন জেনারেল বেলালি।
যেকোনো দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেবল তার সামরিক বাজেটের আকার বা অস্ত্রের মজুতের ওপর নির্ভর করে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের মানসিক দৃঢ়তার ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন যে, যেকোনো অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের চেয়েও দেশের আপামর জনগণের গভীর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ ও ইস্পাতকঠিন ঐক্য অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর ঢাল হিসেবে কাজ করে।
অতীত ইতিহাসের পাতা থেকে বাস্তব উদাহরণ টেনে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি করেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যখনই রাষ্ট্র বা সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাধারণ জনগণের ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করেছে, তখনই তারা সমস্ত দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্র ও যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
তাঁর মতে, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের সুমহান আদর্শের প্রতি সাধারণ মানুষের যে অবিচল আনুগত্য ও নিঃশর্ত সমর্থন যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, সেটিই হলো বর্তমান ইরানের সবচেয়ে বড়, কার্যকর এবং অজেয় কৌশলগত সম্পদ।
মূলত স্বাধীনতাকামী জনগণের এই অটুট মানসিক শক্তির ওপর ভিত্তি করেই ইরানের সশস্ত্র ও সামরিক বাহিনী বাইরের সমস্ত আন্তর্জাতিক চাপ, একপেশে অর্থনৈতিক অবরোধ ও লাগাতার সামরিক হুমকিকে পরোয়া না করে নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আজকের এই অপ্রতিরোধ্য, স্বনির্ভর ও অত্যন্ত সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছে।