শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪৮ বছর আল-আকসায় আজান দেওয়া মুয়াজ্জিন শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজের ইন্তেকাল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

৪৮ বছর আল-আকসায় আজান দেওয়া মুয়াজ্জিন শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজের ইন্তেকাল
ছবি: Collected

পবিত্র মসজিদুল আকসার প্রখ্যাত মুয়াজ্জিন এবং সুপরিচিত কারি শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজ ৬৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে তিনি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম এই মসজিদে অত্যন্ত সুমধুর কণ্ঠে আজান দিয়ে আসছিলেন।

 

গত শনিবার বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। রোববার অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে শত শত ফিলিস্তিনি নাগরিকের উপস্থিতিতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সাথে এই প্রবীণ মুয়াজ্জিনকে শেষ বিদায় জানানো হয়।

 

ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার পবিত্র মসজিদুল আকসা চত্বরে শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর জেরুজালেমের একটি ঐতিহাসিক স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

 

শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজ ছিলেন আল-আকসা মসজিদের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় মুয়াজ্জিন। তিনি ১৯৭৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক মসজিদে আজান দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

 

টানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত আজানের পাশাপাশি তাঁর সুমধুর কণ্ঠের কুরআন তিলাওয়াত জেরুজালেমবাসীর হৃদয়ে এক বিশেষ ও স্থায়ী আধ্যাত্মিক স্থান করে নিয়েছিল।

 

জেরুজালেমের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী কাজ্জাজ পরিবার গত শত শত বছর ধরে পবিত্র মসজিদুল আকসায় আজান দেওয়ার মহান ঐতিহ্য অত্যন্ত সযত্নে লালন করে আসছে। শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজ ছিলেন সেই ঐতিহাসিক বংশপরম্পরা ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকারী।

 

তাঁর এই মহাপ্রয়াণের পর বর্তমানে তাঁর সুযোগ্য সন্তান ফেরাস আল-কাজ্জাজও এই পবিত্র দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে মহান পারিবারিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার নিষ্ঠার সাথে বহন করে চলেছেন।

 

প্রখ্যাত এই মুয়াজ্জিনের মৃত্যুতে ফিলিস্তিনসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মিসরের ধর্মমন্ত্রী ওসামা আল-আজহারি এক বিশেষ শোকবার্তায় গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজের সুমধুর কণ্ঠ দশকের পর দশক ধরে জেরুজালেমবাসীর হৃদয়ে অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি জুগিয়েছে।

 

তিনি ছিলেন ধর্মীয় একনিষ্ঠতা এবং নিবেদিত প্রাণের এক অনন্য ও অনুকরণীয় উদাহরণ। তাঁর সুর ও কণ্ঠ চিরকাল আল-আকসার আকাশ-বাতাস এবং ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।

 

পাশাপাশি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন ইসলামিক জিহাদও তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, আল-আকসার প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং জেরুজালেমের পবিত্র মাটিতে আজীবন অবিচল থাকার এক দীর্ঘ, আত্মত্যাগী ও গৌরবময় সংগ্রাম শেষ করে তিনি বিদায় নিলেন।

 

ফিলিস্তিনিদের কাছে শায়খ নাজি আল-কাজ্জাজের আজান ছিল নিছক কোনো ধর্মীয় উপাসনার ডাক নয়, বরং তা ছিল দখলদার ইসরায়েলের অব্যাহত নানা অমানবিক বিধিনিষেধ এবং জেরুজালেমের মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার লাগাতার অপচেষ্টার বিপরীতে নিজেদের অস্তিত্ব ও প্রতিরোধ রক্ষার এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও জীবন্ত প্রতীক।

 

১৯৬৭ সাল থেকে পূর্ব জেরুজালেম অবৈধভাবে দখল করে রাখা ইসরায়েল বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করলেও, দীর্ঘকাল ধরে কাজ্জাজ পরিবারের আজানের ধ্বনি সেখানে ইসলামের উপস্থিতিকে চিরস্মরণীয় ও সুদৃঢ় করে রেখেছে।

 

শনিবার আল-আকসার মাইক থেকে যখন তাঁর মৃত্যুর বেদনাবিধুর সংবাদটি প্রথম প্রচার করা হয়, তখন পুরো এলাকায় এক গভীর বিষাদ ও শোকের ছায়া নেমে আসে।