এই বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করে তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রতি এক আবেগঘন ও জোরালো বার্তা প্রদান করেছেন। শুক্রবার তুরস্কের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এনসোস্যালে দেওয়া এক দীর্ঘ ও স্মৃতিচারণমূলক বার্তায় প্রেসিডেন্ট এরদোগান আয়া সোফিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর ফিরে পাওয়া পরিচয়ের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে, দীর্ঘ ছিয়াশি বছরের এক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আয়া সোফিয়া তার প্রকৃত ও মূল পরিচয় ফিরে পেতে সক্ষম হয়েছিল। এই অনন্য অর্জনকে একটি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, স্রষ্টার অশেষ রহমতে এই বরকতময় ও পবিত্র মসজিদে অনন্তকাল ধরে আজানের সুমধুর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।
আয়া সোফিয়ার এই নবজাগরণ ও পুনরুত্থান সমগ্র মানবজাতি এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনবে বলে তিনি তাঁর বাণীতে প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আয়া সোফিয়ার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সভ্যতার উত্থান-পতনের নানা রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ইতিহাসবিদদের মতে, সুদীর্ঘকাল আগে এই দৃষ্টিনন্দন ও বিশালাকার স্থাপনাটি মূলত একটি অর্থোডক্স উপাসনালয় হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকলার এক অনবদ্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই ইমারতটি টানা নয়শো ষোলো বছর ধরে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
এর সুবিশাল গম্বুজ ও নান্দনিক কারুকাজ তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ছিল, যা আজও অগণিত দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। এরপর বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে চৌদ্দশো তিপ্পান্ন সালে।
অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী শাসক সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ যখন কনস্টান্টিনোপল তথা বর্তমান ইস্তাম্বুল জয় করেন, তখন আয়া সোফিয়ার ভাগ্যও নতুন মোড় নেয়। শহর জয়ের পর সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ তাঁর নিজস্ব ওয়াকফ দলিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রাচীন উপাসনালয়টিকে একটি মসজিদে রূপান্তরিত করেন।
এরপর থেকে শত শত বছর ধরে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রধান মসজিদ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে থাকে এবং ইসলামি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এই দীর্ঘ সময়ে মসজিদটির চারপাশে মিনার নির্মাণসহ ইসলামি স্থাপত্যরীতির বিভিন্ন আকর্ষণীয় উপাদান যুক্ত করে এর সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়।
তবে আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে আয়া সোফিয়া আবারও এক নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হয়। উনিশশো চৌত্রিশ সালে তুরস্কের তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদের এক বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাদুঘরে রূপান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
এরপর থেকে দীর্ঘ ছিয়াশি বছর ধরে স্থাপনাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর হিসেবেই বিশ্ববাসীর কাছে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ১০ জুলাই তুরস্কের আইনি কাঠামোর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত, যা কাউন্সিল অব স্টেট নামে পরিচিত, এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে উনিশশো চৌত্রিশ সালের সেই বিতর্কিত মন্ত্রিপরিষদ অধ্যাদেশ বাতিল বলে ঘোষণা করে।
এই যুগান্তকারী আইনি সিদ্ধান্তের ফলেই দীর্ঘ কয়েক দশক পর ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি পুনরায় মসজিদ হিসেবে চালু করার সকল আইনি পথ সুগম হয়। আদালতের এই রায়ের পর পরই প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে আয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেন।
২০২০ সালের জুলাই মাসে দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রেসিডেন্ট এরদোগানসহ হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ঘটনাটি তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৃহত্তর বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
তুর্কি সরকার বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছে যে, মসজিদ হিসেবে এর পুনরুত্থান ঘটলেও, আয়া সোফিয়া তার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হারাবে না। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে আসা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল দর্শনার্থী ও পর্যটকদের জন্য এই অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শনটির দরজা আগের মতোই উন্মুক্ত রয়েছে।
বাইজেন্টাইন ও ইসলামি স্থাপত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে আয়া সোফিয়া বিশ্বের দরবারে সমাদৃত। তুরস্কের জনগণের কাছে এটি কেবল একটি প্রাচীন ইমারত নয়, বরং এটি তাদের স্বাধীন আত্মপরিচয়, ঐতিহাসিক গৌরব এবং ধর্মীয় চেতনার এক প্রমূর্ত প্রতীক।
প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাম্প্রতিক বার্তায় সেই গভীর আবেগ ও জাতীয়তাবাদী চেতনারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বিশ্বকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আয়া সোফিয়ার এই প্রত্যাবর্তন তুরস্কের ঐতিহাসিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।