আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনের হাজারো কোলাহলের মাঝে এই দিনটিকে ঘিরে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক প্রশান্তি, সামাজিক আনন্দ এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধের আবহ তৈরি হয়। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই এই দিনটিকে অন্যান্য সকল দিনের ওপর বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
পবিত্র কোরআন ও প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে এই দিনের অপরিসীম তাৎপর্য ও বিশেষ কিছু ইবাদতের কথা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে, যা পালন করার মাধ্যমে একজন মুমিন তার আত্মিক পরিশুদ্ধি ও জাগতিক কল্যাণ লাভ করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, জুমার দিনের এই আমলগুলো কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতই নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। জুমার দিনের আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু হয় একেবারে ভোরবেলা থেকে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনাদর্শ বা সুন্নাহ থেকে জানা যায়, তিনি জুমার দিন ফজরের নামাজে বিশেষ দুটি সুরা তিলাওয়াত করতেন, যার মর্মার্থ অত্যন্ত সুগভীর।
বিখ্যাত ও প্রামাণ্য হাদিস গ্রন্থ সহিহ বুখারিতে প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী করিম (সা.) শুক্রবার ফজরের নামাজে ‘সুরা আস-সিজদা’ এবং ‘সুরা আল-ইনসান’ নিয়মিত পাঠ করতেন।
ইসলামি স্কলারদের মতে, জুমার দিন এই সুরা দুটি নির্বাচনের পেছনে এক বিশাল দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ নিহিত রয়েছে। এই সুরাগুলোতে মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টিরহস্য, মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুত্থান এবং কিয়ামতের ময়দানে সমগ্র মানবজাতির সমবেত হওয়ার মতো মহাজাগতিক ও অবশ্যম্ভাবী বিষয়গুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে আলোচিত হয়েছে।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী জুমার দিনেই মহাপ্রলয় বা কিয়ামত সংঘটিত হবে। তাই সপ্তাহের এই বিশেষ দিনের শুরুতে এই সুরাগুলো পাঠ করার মাধ্যমে সমগ্র উম্মতকে তাদের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি এবং পরকালের জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, যা মানুষকে পাপকাজ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
জুমার নামাজের জন্য শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা অর্জনের ওপর ইসলামে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই দিনের প্রস্তুতির একটি অপরিহার্য ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো ভালোভাবে গোসল করা এবং নিজের কাছে থাকা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা।
তিরমিজি শরিফে বর্ণিত একটি হাদিসে সালিম (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যে ব্যক্তি জুমার নামাজ আদায় করার উদ্দেশ্যে মসজিদে আসবে, সে যেন অবশ্যই গোসল করে আসে। শারীরিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি মানসিক প্রফুল্লতা বৃদ্ধির জন্য সুগন্ধি ব্যবহারের প্রতিও ইসলামে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সহিহ বুখারিতে আবু সাইদ খুদরি (রা.)-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে, জুমার দিন সাধ্যমতো সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা মুমিনদের জন্য একটি অত্যন্ত উত্তম ও পছন্দনীয় কাজ। এমনকি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) জুমার দিন দ্বিপ্রহরে মুসলমানদের সুগন্ধি ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিতেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
সুনানে ইবনে মাজার একটি নির্ভরযোগ্য হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে, পরিপূর্ণভাবে পবিত্রতা অর্জন করে, তার সামর্থ্য অনুযায়ী সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং পরিবারে থাকা সুগন্ধি শরীরে লাগিয়ে মসজিদে গমন করে, তবে তার জন্য মহান রবের পক্ষ থেকে বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে।
মসজিদে যাওয়ার ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা এবং আগে আগে উপস্থিত হওয়াকে অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মসজিদে প্রবেশ করার পর জুমার মূল আনুষ্ঠানিকতা তথা ইমামের খুতবা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সময়টিকে ঐশী ইবাদতের এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর নির্দেশনা রয়েছে।
এ সময় মুমিনরা সাধারণত নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত এবং মহান আল্লাহর জিকিরে নিজেদের মশগুল রাখেন। তবে জুমার নামাজের সবচেয়ে স্পর্শকাতর, তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয় অংশ হলো ইমামের প্রদত্ত খুতবা।
খুতবা চলাকালে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকা এবং অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করা প্রতিটি উপস্থিত মুসল্লির জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সুনানে নাসায়িতে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, খুতবা চলাকালে কেউ যদি তার পাশের কথা বলতে থাকা ব্যক্তিকে নিছক ‘চুপ থাকো’ কথাটিও বলে, তবে সে একটি অনর্থক বা বাতিল কাজ করল বলে পরিগণিত হবে।
এর মাধ্যমে মূলত খুতবার সময় কঠোর নীরবতা ও শৃঙ্খলা পালনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মসজিদে এসে অন্যদের কষ্ট দিয়ে, দুজনের মাঝে ফাঁক করে বা ডিঙিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়াকেও ইসলামে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, যাতে সামাজিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকে।
ইসলামের যে কয়েকটি ফরজ বা অবশ্য পালনীয় বিধান রয়েছে, তার মধ্যে জুমার নামাজ অন্যতম প্রধান ও সামাজিকভাবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। পবিত্র হজের সময় মক্কার ঐতিহাসিক আরাফার ময়দানে সমবেত হওয়ার পর, জুমার দিনেই বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুসলমান একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহান রবের দরবারে সিজদাবনত হন।
এই নামাজের গুরুত্ব এতই অপরিসীম যে, যারা অলসতা, অবহেলা বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে জুমার নামাজ বর্জন করে, তাদের হৃদয়ে আল্লাহ তাআলা মোহর মেরে দেন বলে হাদিসে চরমভাবে সতর্ক করা হয়েছে। জুমার ফরজ নামাজে কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ রয়েছে।
সহিহ মুসলিম শরিফে নুমান ইবনে বশির (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী করিম (সা.) দুই ঈদের নামাজ এবং জুমার নামাজে সাধারণত ‘সুরা আল-আলা’ এবং ‘সুরা আল-গাশিয়াহ’ তিলাওয়াত করতেন। আবার কোনো কোনো প্রামাণ্য বর্ণনায় জুমার নামাজে ‘সুরা জুমুআ’ তিলাওয়াতের কথাও স্পষ্টভাবে জানা যায়।
এর বাইরে জুমার দিনের আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ব্যক্তিগত আমল হলো পবিত্র কোরআনের ‘সুরা কাহফ’ তিলাওয়াত করা। আত-তারগিব গ্রন্থে আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য ওই জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সম্পূর্ণ সময়টুকু একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক আলো বা জ্যোতিতে পরিপূর্ণ থাকবে।
এই মর্যাদাপূর্ণ দিনে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আবু দাউদ শরিফের হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং উম্মতকে জুমার দিন তাঁর ওপর বেশি পরিমাণে দরুদ পাঠ করার আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ এই পবিত্র দিনে উম্মতের পঠিত দরুদ সরাসরি তাঁর সামনে সসম্মানে পেশ করা হয়।
সর্বোপরি, জুমার দিনটি মূলত মহান রবের পক্ষ থেকে বান্দার জন্য অবারিত ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাত লাভের এক মহাসুযোগ। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো মুসলিম যদি পরিপূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করে জামে মসজিদের দিকে হেঁটে যায় এবং ইমামের নামাজ শেষ করা পর্যন্ত পূর্ণ নীরবতা ও ধর্মীয় আদব বজায় রাখে, তবে ওই নামাজ তার পূর্ববর্তী জুমা থেকে বর্তমান জুমা পর্যন্ত সংঘটিত হওয়া সকল সাধারণ গুনাহের কাফফারা বা মোচনকারী হয়ে যায়, যদি সে ধ্বংসাত্মক বা কবিরা গুনাহ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখে।
জুমার দিনের এই অশেষ রহমত ও করুণাধারা কেবল জীবিতদের জন্যই নয়, বরং মৃতদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। সুনানে আবু দাউদ শরিফে আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, জুমার দিন ছাড়া সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে ঠিক দুপুরে জাহান্নামের আগুনকে প্রচণ্ডভাবে উত্তপ্ত করা হয়, যা জুমার দিনে বন্ধ থাকে।
ইসলামি আকিদায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, জুমার দিনে বা বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে যে মুমিন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন, আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করেন। এটি মূলত জুমার দিনের বরকতেরই একটি অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
সবশেষে, জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ ও অতি সংক্ষিপ্ত মুহূর্ত রয়েছে, যে সময়ে বান্দার যেকোনো বৈধ দোয়া, আকুতি বা প্রার্থনা মহান আল্লাহর দরবারে সরাসরি কবুল হয়ে যায়। সহিহ মুসলিম শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, জুমার দিনের এই বিশেষ মুহূর্তে কোনো মুসলিম কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে যা কিছুই কল্যাণ প্রার্থনা করুক না কেন, আল্লাহ তাকে তা নিশ্চিতভাবে দান করেন।
প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ও উলামায়ে কেরামের বৃহৎ অংশের সুচিন্তিত অভিমত অনুযায়ী, দোয়া কবুলের এই মহামূল্যবান ও প্রতীক্ষিত সময়টি হলো জুমার দিন আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের আজান বা সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত এই মহিমান্বিত দিনের প্রতিটি ক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা।