শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামের ইতিহাসে ৫ প্রভাবশালী নারী সাহাবি ও তাঁদের কীর্তি

আর এন এস ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৫, ০১:৪৩ পিএম

ইসলামের ইতিহাসে ৫ প্রভাবশালী নারী সাহাবি ও তাঁদের কীর্তি
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের সূচনাকালে মক্কা ও মদিনায় ইসলামী সমাজ গঠন এবং মুসলিম সমাজের চিন্তা, চেতনা ও জীবনধারায় নারীরা যে ব্যাপক অবদান রেখেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারী সাহাবিদের ত্যাগ, ভালোবাসা, বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞা মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য আজও প্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস। সেই মহীয়সী নারীদের অবদান আজও মুসলিম সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে চলেছে। ইসলামী ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা রাখা তেমনই পাঁচজন প্রভাবশালী নারী সাহাবি এবং তাদের অনন্য কীর্তি এখানে তুলে ধরা হলো:

 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা.) ইসলামী ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী নারীদের অন্যতম। ‘উম্মাহাতুল মুমিনীন’ বা ‘মুমিনদের জননী’ হিসেবে পরিচিত এই মহীয়সী নারী ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রথম ও কঠিনতম দিনগুলোতে মহানবী (সা.)-কে প্রায় একাই সহযোগিতা ও অর্থায়ন করেছিলেন। নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্যে তিনি ছিলেন সফল এবং মক্কার ধনী ও সম্মানিত নারী। নবুয়তের পূর্বে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে ব্যবসার কাজে নিয়োগ দেন এবং পরবর্তীতে নিজেই তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। নবী করিম (সা.) সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানান এবং তার জীবদ্দশায় আর কোনো নারীকে বিয়ে করেননি। ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করলে নবীজি (সা.) নিজ হাতে তাকে কবরে দাফন করেন। ইসলামের কঠিনতম সময়ে মহানবী (সা.)-কে অকৃত্রিম সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খাদিজা (রা.)-এর কনিষ্ঠ কন্যা ফাতিমা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও ঈমানদার নারী। নবী করিম (সা.) তাকে ইসলামী জ্ঞানে শিক্ষা দিয়েছিলেন এবং কঠিনতম সময়েও তিনি ঈমানের ওপর অটল ছিলেন। তাঁর প্রতি মহানবী (সা.)-এর গভীর স্নেহ ছিল, যা এক হাদিসে প্রকাশ পেয়েছে: "যে ফাতিমাকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়; আর যে আমাকে কষ্ট দেয়, সে আল্লাহকে কষ্ট দেয়।"

 

প্রতিদিন ফজরের নামাজের পথে মহানবী (সা.) তার ঘরের সামনে এসে বলতেন, "আস-সালামু আলাইকুম, হে নবুওয়াতের ঘর ও বার্তার ধারক পরিবার।" ফাতিমা (রা.) আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাদের সন্তানরা ছিলেন—হাসান, হুসাইন, মুহসিন, যায়নাব ও উম্মে কুলসুম। মুসলিম নারীদের কাছে তিনি ঈমান, নম্রতা ও সাহসিকতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছেন। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে তার ইন্তেকাল হয়।

 

ফাতিমা (রা.) ও আলীর (রা.) কন্যা যায়নাব (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক অতুলনীয় সাহসী নারী। তিনি নবীর দৌহিত্র হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় কণ্ঠে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন।

 

কারবালার ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের পর বন্দি অবস্থায় তাকে ইয়াজিদের দরবারে হাজির করা হয়। সেখানে তিনি এক ঐতিহাসিক ও তেজদীপ্ত ভাষণ দেন: “হে ইয়াজিদ! আজ তুমি শাসক, কিন্তু কাল কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ বিচারক হবেন। তখন তোমার হাত-পা তোমার অপরাধের সাক্ষ্য দেবে। তুমি যে নবীর সন্তানদের হত্যা করেছ, সেটিই হবে তোমার জন্য চরম লজ্জা।” কারবালার পর নির্বাসিত অবস্থায় থেকেও যায়নাব (রা.) ইসলামের দাওয়াত ও ন্যায়ের বার্তা ছড়িয়ে যান। আজও তিনি নির্যাতন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

 

হাফসা (রা.) ছিলেন নবী করিম (সা.)-এর স্ত্রীদের অন্যতম এবং ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর সুযোগ্যা কন্যা। প্রথম স্বামী খুনাইস ইবনে হুযাইফা (রা.)-এর শাহাদাতের পর তিনি বিধবা হন। এরপর নবী (সা.) তাকে বিবাহ করেন।

 

হাফসা (রা.)-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো কোরআন সংরক্ষণ। কোরআন শরীফ লিখিত আকারে সংরক্ষিত হওয়ার আগেই তিনি সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ করেছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই প্রথম লিখিত কোরআনের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল, যা পরবর্তীতে খলিফা উসমান (রা.) কর্তৃক কোরআনের মানক সংস্করণ (মুসহাফ) তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। এই কারণে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তাঁর এই অবদানের ফলেই কোরআন আজ পর্যন্ত অক্ষতভাবে সংরক্ষিত আছে।

 

খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর নবী করিম (সা.) আয়েশা (রা.)-কে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি ও ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কন্যা। তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে নবীর ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ, উত্তরাধিকার এবং হজসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকনির্দেশনা রয়েছে।

 

আয়েশা (রা.) একাধারে শিক্ষক, আলেমা ও মুফাসসিরা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে অনেক সাহাবিও তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। জ্ঞান ও ধর্মীয় প্রভাবের কারণে আয়েশা (রা.) ইসলামের ইতিহাসে এক অমূল্য নাম। তিনি ৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। এই পাঁচজন নারী সাহাবি শুধু ইতিহাসের পাতায় স্থান পাননি, বরং তাদের ঈমান, সাহস, জ্ঞান ও ত্যাগ আজও বিশ্বজুড়ে মুসলিম নারীদের জন্য এক জীবন্ত ও উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে চলেছে।